৪৪২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২১ তম পর্ব )
৪৪২ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২১ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে --ঋগ্বেদ শুধুমাত্র একটা কবিতার বই ছিল না। একই সাথে কবিতা,ধর্ম, প্রকৃতি চিন্তা, সামাজিক ভাবনা, রাজনীতি ও যুদ্ধের স্মৃতি, ভাষার প্রাচীন নিদর্শন, মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে এবং বিশ্বসৃষ্টির রহস্য নিয়ে অনুসন্ধান।
২১ তম পর্ব ........
মহাভারতের ধর্ম, নৈতিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদির ধরণ-ধারণ খুঁজতে বৈদিক যুগে বারবার ফিরে যেতে হচ্ছে। অতীতের কাছ থেকে বর্তমান সর্বদাই প্রভাবিত হয় কিংবা শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় পক্ষপাতশূন্য ও বস্তুনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পাওয়ায়, বৈদিক সাহিত্য আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের বাধ্য করেছে সেই সত্যকে মেনে নিতে, যে নৈতিক মূল্যবোধ ধর্মীয় চিন্তাধারা প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন পদ্ধতির বিশেষ স্তরে বৈদিক জনগোষ্ঠীর বিশেষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের পরিচয় বহন করছে।
জনসাধারণের মধ্যে থেকে তাদেরই নিগূঢ় অনুপ্রেরণার তাগিদে এই সাহিত্যের জন্ম বলেই জনসাধারণের বৈষয়িক জীবনযাত্রার বিধি দিয়েই তা মূলত নিয়ন্ত্রিত।
ঋগ্বেদ ভারতীয় সাহিত্যের পূর্বসূরি। অসঙ্খ্য মন্ত্রের ছড়াছড়ি, প্রায় হাজার খানেক বা তারও বেশি, তাদের আষ্টেপিষ্ঠে বেঁধে রেখেছে দশটি মন্ডল। দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল এই গ্রন্থের একদম পুরোনো।
প্রথম মন্ডলের কিছু অংশ এবং দশম মন্ডলে একটু ভিন্ন স্বাদের গন্ধ পাওয়া যায়। নতুন নতুন বিশ্বাস, নব নব ধারণার ও দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চেতনাকে কেন্দ্র করে এক নতুন ভাবনার জোয়ার আনে।
সপ্তম মন্ডলের পর অনুরূপ ধারাবাহিকতা না থাকায়, মনে হয়, পূর্বেকার জনগোষ্ঠীর স্থানে নতুন কোন জনগোষ্ঠীর আগমন হয়েছিল। প্রথম মন্ডলের প্রথম অংশ ও তার সাথে দশম মন্ডলে মহাভারতের যুদ্ধের সমসাময়িক, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ বছর পূর্বের রচনা।
মানুষ ততদিন পর্যন্ত একত্রিত ছিল যতদিন পর্যন্ত খাদ্য ও নিজ জীবনকে বিপদ থেকে মুক্ত করবার জন্য সকলের সাথে মিলেমিশে থাকার প্ৰয়োজনীয়তা ছিল।
সংহিতা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হলো - প্রাথমিক পর্য্যায়ে, যেখানে বিষয়বস্তুর প্রাণকেন্দ্র ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি। তারপর বেশ কিছু শতাব্দীর, যার ব্যবধান অন্তত ৫০০ বছর, সেখানে দেখা যায় প্রাচীন সমাজের অনেককিছুই কালের গহ্বরে বিলীন হয়ে গিয়ে, সেই স্থান দখল করে নিয়েছে নাগরিক সংস্কৃতি।
হারিয়ে গেছে সেই শ্রেণীহীন সমাজ, উৎপাদন পদ্ধতির রুপান্তরের সাথে সাথে সমাজের আনাচে-কানাচে উঁকি দিতে শুরু করেছে শ্রেণী বিভাজন। কারণ অবশ্যিই আছে। অনেক কারণের মধ্যে লোহার আবিষ্কার আর লোহা দিয়ে ফলার ব্যবহারের ফলে কৃষি ব্যবস্থার প্রসার এবং সেই কারণে ফসল উৎপাদন প্রয়োজেনের তুলনায় অতিরিক্ত হওয়াতে উদ্বৃত্ত পণ্যের সঞ্চয় হতে শুরু করে।
এক শ্ৰেণীৰ জনগোষ্ঠী যারা সংখ্যায় নগন্য কিন্তু শাসন ক্ষমতা হস্তগত করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে শাসন করার ক্ষমতা অর্জন, ক্রমবর্ধমান সম্পদ বৃদ্ধি, মুদ্রা ব্যবস্থার সূত্রপাত, পূর্বাঞ্চলে তামা ও লোহার খনির আবিষ্কার ইত্যাদি কারণে জনগোষ্ঠী সেই সব স্থানে বসতি স্থাপনে যাত্রা শুরু করে। সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত সম্পদের অধিকারী হতে শুরু করে।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এক একটি আবিষ্কার কি ভাবে জনজীবনকে প্রভাবিত করে। ধাতু আবিষ্কারের ফলে কারিগরি বিদ্যার প্রসার, জ্যোতির্বিদ্যার চর্চ্চার কারণে পঞ্জিকার প্রবর্তন এবং তার ফলে কৃষি ও নৌবাণিজ্যের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা আর সেখান থেকে বাণিজ্যের প্রসার।
দূর থেকে বাসনা লক্ষ্য করে উপযুক্ত পরিবেশের আর যেই না বস্তু জগতের শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে শুরু করলো, সেই সঙ্গে রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রেও বাসনা দানা বাঁধতে শুরু করলো। একদিন যারা শুধুমাত্র নিজ নিজ রাজ্যের গোষ্ঠীপতি ছিল, বাসনার গভীর প্লাবনে তারা রাজা হয়ে রাজ্যকে শাসন করতে বদ্ধপরিকর হলো।
উৎপাদন ব্যবস্থা কি ভাবে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো সেদিনের কৃষি ব্যবস্থার বিকাশ। একদিন যেখানে স্ত্রী-পুরুষ এক সাথে কৃষি কার্য্যে শ্রম বিনিয়োগ করতো, এই উন্নত ব্যবস্থায় কৃষিকার্য্যে নারীর শ্রমের প্রয়োজনীয়তা সংকুচিত হল।
পৃথিবীতে প্রথম শ্রমবিভাজন শুরু হয়েছিল নারী আর পুরুষের মধ্যে। এইসময় নারী পুরুষের উপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠলো আর নারী গৃহকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করল। যেহেতু গৃহ কর্ম উৎপাদনের সাথে সংযুক্ত নয় এবং এখানে শ্রম বিনিয়োগ করলে অর্থ আসেনা আর কৃষিকার্য করলে অর্থের আগমন হয়। যেহেতু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নে নারীর ভূমিকা না থাকায় তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্রমেই হ্রাস পেতে লাগলো।
যৌথভাবে ভোগ করা সামাজিক স্বাধীনতা পর্য্যবসিত হলো শুধুমাত্র পুরুষের একক স্বাধীনতায়। আর্য্য পুরুষরা প্রায়ই অনার্য্য সমাজের নারীদের বিবাহ করতো কিন্তু সেই নারীরা পরিপূর্ণভাবে সামাজিক স্বীকৃতি পেতো না, তার ফলে, সমাজে সেই সব নারীদের মর্য্যাদা কমতে শুরু করে। পুরুষেরা বারাঙ্গনা রমণীর সাহচর্যে প্রায়শই যেত শুধু নয়, পাশাপাশি পরস্ত্রীর সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে সমাজ কোন বাধা নিষেধ আরোপ করতো না। পারিবারিক সম্পত্তিতে নারীর কোন অধিকার সে সময় ছিল না।
সমাজ যখন আর্থিক বৈষম্যের কারণে সাম্যাবস্থায় থেকে শ্রেণী বিভাজনের দিকে এগিয়ে যায় , সেই সন্ধিক্ষনে ঘুমন্ত ভাবনাগুলি জেগে উঠে আর সেই কারণে বিভিন্ন বর্ণের দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলি বেশ কঠোরভাবে প্রবর্তিত হতে শুরু করে।
সমাজে একদিক যখন একদল মানুষ অধিকার হারিয়ে নিঃস্ব হতে বসে, তখন আরেক শ্রেণী ক্রমাগত উচ্চতায় উঠতে শুরু করে। নিত্যনতুন যজ্ঞের প্রাদুর্ভাব হওয়াতে পুরোহিত বৃত্তিতে বহু ব্রাহ্মণদের প্রয়োজন হয়ে পরে। প্রত্যেক বেদের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পুরোহিতদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এক বিশেষ ধরণের পুরোহিত মন্ডলী তৈরি হলো।
রাজারা যখন যুদ্ধ বৃত্তিতে মগ্ন তখন পুরোহিতরা নিত্য নতুন যজ্ঞের পরিকল্পনায় বিভোর। যুদ্ধে জয়ী হলে রাজার সম্পদ বৃদ্ধি হতো, সেই সঙ্গে উপার্জিত সম্পদ থেকে খানিকটা অংশ বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে পুরোহিতরা যজ্ঞনুষ্ঠানের নামে নিজেদের হিত সাধন করতো।
যজুর্বেদে এর বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। জাতিভেদ ও ধর্মচারণ এই দুইয়ের সম্মিলিত মেলবন্ধনে পরবর্তী বৈদিক যুগে ধর্মচারণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কলমে - রবীন মজুমদার
মন্তব্যসমূহ