৪৪৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৫ তম পর্ব )

 ৪৪৬ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৫ তম   পর্ব ) 



( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে  উস্কে দেয় )    

গত সংখ্যায় যা আছে -কাল আমাদের কারও জন্য থামবে না; কিন্তু আমরা কালের পথে এমন কিছু রেখে যেতে পারি, যার কাছে একদিন কাল নিজেই থমকে দাঁড়াবে।আর সেই দিনই হয়তো ইতিহাস মৃদু হেসে বলবে—“নাটক শেষ হয়নি; শুধু তোমার দৃশ্যটি শেষ হয়েছে।”

২৫ তম   পর্ব ........

  মানুষের  জন্মলগ্ন থেকে "ভয়" ও জীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। ভয়ের উৎপত্তি যেমন আছে তার নিষ্পত্তিও নিশ্চয়ই আছে। বস্তু জগতে যে কোন সৃষ্টির পরিণতি আছে। যেমনটি ভয় সাহসে বিবর্তিত  হয়ে পরিণতি লাভ করে। 

প্রেক্ষিতটা ছিল "তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ" (৩: ৮: ৪: ১৫) গ্রন্থে একটি স্থানে বলা আছে, ব্রাহ্মণদের  দক্ষিণা প্রদান করার কথা। ব্রাহ্মণরা প্রচার করেছিল 'দক্ষিণা' হচ্ছে  সেই ঔষধ যার মাধ্যমে যজমান তার অপরিচ্ছন ও অন্ধকারময় জীবনের থেকে যে  পাপ সঞ্চয় করে, সেই সঞ্চয়কৃত পাপের ভান্ডারকে একমাত্র নির্মূল  করতে পারে এই দান। এই প্রথার অভিমুখটা ছিল  আর্থিক সমৃদ্ধি আর তার ঢাল ছিল এই  "ভয়" নামক মানুষের অন্তরের দুর্বলতা।  ভয়ের কারণ খুঁজতে উৎসের সন্ধানে যাত্রা করতে হবে। 

যদি শুরু করা হয় সেই শিশুর শৈশব থেকে , তাহলে দেখা যায় যে , মা শিশুকে ভয় দেখাচ্ছে যাতে শিশু মা'র সৃষ্ট জগতের চৌহদ্দির বাইরে সে যেতে না পারে।  ভয়কে মূলধন হিসাবে বিনিয়োগ করে পুরোহিত থেকে শাসক ক্ষমতা আর আর্থিকভাবে লাভবান হয়।  ভয়ের স্বরূপকে দুইভাগে ভাগ করা যায়- অজ্ঞাত কারণে জন্ম নেওয়া ভয়, যাকে প্রাকৃতিক কারণে ভয় বলা যেতে পারে এবং মানুষের দ্বারা সৃষ্ট ভয়। কিন্তু এর থেকেও সুক্ষ ব্যাখ্যা আছে। 

ভয়ের একেবারে আদিম উৎস সম্ভবত বেঁচে থাকার তাগিদ। মানুষ যখন প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে ছিল, তখন অন্ধকার, হিংস্র পশু, বজ্রপাত, আগুন, বন্যা, রোগ, খাদ্যের অভাব—এসবের সামনে তার জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সীমিত। যে বিপদকে সে বুঝতে পারত না, তার প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্কতা, পলায়ন অথবা আক্রমণ।

আবার অন্যদিকে ভয় যদি না থাকতো, তাহলে মানুষ হয়তো সিংহের সামনে  দাঁড়িয়ে তর্ক জুড়ে দিতো। সেক্ষেত্রে ভয় একটা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা  হিসাবে ধরে নেওয়া যায়। 

অদ্বৈত বেদান্তে একটা সুন্দর উদাহরণ আছে -"রজ্জুতে সর্প ভ্রম। " 

দড়ি আছে বলেই তাকে অন্ধকারে ভুল করে সাপ ভাবা সম্ভব। কিন্তু সাপ মনে করাটা অজ্ঞানের ফল। জ্ঞান স্বরূপ আলো যখন জ্বলে উঠে তখন সত্য সামনে ফুটে ওঠে, তখন প্রকাশ পায়  যে সাপ কখনো ছিল না। এটা কোন দার্শনিক উদাহরণ নয়, এর মাধ্যমে মানুষের ভয়, অজ্ঞানতা এবং বাস্তবতাকে ভুলভাবে দেখার এক অসাধারণ মনোস্তত্ত্বিক উপমাও।  

সেদিনের মানুষ অজ্ঞানতার বশে বজ্রপাতকে ভাবতো দেবতা কুপিত হয়েছেন। সূর্য্যগ্রহনকে ভাবতো অশুভ সংকেত , রোগ ছিল কোন এক অদৃশ্য শক্তির অভিশাপ, ভূমিকম্প ছিল ঈশ্বরের রোষানল, মৃত্যুর পরের জগৎ ছিল এক অজানা আতঙ্ক। 

জ্ঞান ভয়কে পুরোপুরিভাবে বিলুপ্ত করে না,  অনেক সময় শুধু ভয়ের প্রকৃতি বদলে  দেয়। 

 যখন সমাজ গড়ে উঠলো তখন মানুষই মানুষের বিরুদ্ধে  ভয় নামক অস্ত্রকে  প্রয়োগ করতে শুরু করলো, তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। একদিন ভয় একটা সীমিত পরিসরে মানুষকে ভয় দেখাতো আজ সেটা তার চরিত্রকে একটু সংশোধন করে নবরূপে এসে উপস্থিত হয়েছে, সেখানে আছে - চাকরি হারানোর ভয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হারানোর ভয়, সামাজিক সম্মান হারানোর ভয়, রাষ্ট্রের ভয়, ভবিষ্যতের ভয়। 

সব কিছুকে ছাপিয়ে ভয় তার জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।  সময়ে সময়ে সে হয়তো  তার জামা পাল্টিয়েছে কিন্তু তার চরিত্র বদলায়নি। পুরোহিতরা আজও  তার যজমানদের ভুল বোঝায়, শাসক শাসিতের প্রতি ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি  করে শাসন কায়েম রাখতে চায় কিন্তু বিজ্ঞান বারবার তাকে ব্যর্থ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়।  

 চলবে ০০০০০০০০০০

কলমে - রবীন মজুমদার 
০৪/০৯/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)