৪৪৭ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৬ তম পর্ব )
৪৪৭ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৬ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে -পুরোহিতরা আজও তার যজমানদের ভুল বোঝায়, শাসক শাসিতের প্রতি ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করে শাসন কায়েম রাখতে চায় কিন্তু বিজ্ঞান বারবার তাকে ব্যর্থ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়।
২৬ তম পর্ব ........
" জন্ম-জন্মান্তর থেকে মানুষের অনুভূতিতে 'ভয়' তার স্থান পাকাপাকিভাবে দখল করে ছিল। একদিন সেই অধিকার যখন কোন ব্যক্তি বা কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়, তখন সেই অনুভূতিই ক্ষমতার অস্ত্র হয়ে ওঠে " - দর্শনের অধ্যাপক বিভাস ভারতীয় সমাজে বিভাজনের ইতিহাসের সাথে 'ভয়' প্রসঙ্গকে কিভাবে টেনে নিয়ে এলো - এই নিয়ে শ্রোতা মন্ডলীর মধ্যে একটু খটকা লাগলো।
- বিভাস পত্নী লাবণ্যই প্রথম প্রশ্ন করলো ভয়ের সাথে বিভাজনের সম্পর্ক কি ?
-হ্যাঁ, বিভাস বলল - সম্পর্ক অবশ্যিই আছে, কিন্তু তাকে সম্পর্কিত হতে আলোচনার খানিকটা পথ পার হতে হবে। মানুষের সভ্যতার ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে তার উৎস খুঁজতে গেলে প্রথমেই যে শব্দটির কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হয়, সেটি—প্রশ্ন।
প্রশ্ন থেকে উত্তর। উত্তর থেকে আবার নতুন প্রশ্ন।
সেই প্রশ্নের হাত ধরেই মানুষ অন্ধকারের ভিতর থেকে একটু একটু করে আলোয় এসেছে।
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস আসলে মানুষের চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাস।
নরেন প্রশ্ন করলো - চিন্তার বিবর্তনটা কি ?
- যে কোন বিষয় আত্মপ্রকাশ করার পিছনে এক অদ্ভুত ধারাবাহিকতা আছে। চিন্তাও সেই পথ দিয়েই এসেছে।
নরেন আবার প্রশ্ন করল - চিন্তা কি একটা ব্যাধি ?
- না, চিন্তা একটা প্রক্রিয়া, যা লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অন্তরালে থেকে কাজ করতে থাকে।
মনে করো, এক নিস্তরঙ্গ পুকুরে হঠাৎ একটা ঢিল এসে পড়লো, চকিতে ঘুমিয়ে থাকা ইন্দ্রীয় ইতিউতি খুঁজতে শুরু করলো, ঢিল পড়ার কারণকে। মনে বহু প্রশ্ন এসে ভিড় করলো। এরা প্রত্যেকেই চিন্তা পরিবারের সদস্য, এদের নিয়েই চিন্তার সংসার ।
প্রথমে বিস্ময়, বিস্ময় থেকে প্রশ্ন, সেই থেকে অনুসন্ধান, তার থেকে জ্ঞান অবশেষে চিন্তার অবকাশ।
সন্দেহ থেকেই চিন্তার জন্ম। ভারতীয় দর্শনে চিন্তার জন্মকে বর্ণনা করেছে - ইন্দ্রীয় -মন- বুদ্ধি- সিদ্ধান্ত- অহংকারের সম্পর্ক-"আমি করেছি " আর চিন্তার গভীরে আছে "ভেদ" সৃষ্টি।
লাবণ্য বলল - মৌলিক অনুসন্ধানটা কি ?
- কোনও কিছু সত্য না মিথ্যা, তা জানার আগে সেই বস্তুটিকে জানতে হয়। জানা আর অজানার মাঝখানে যে দূরত্ব, তাকে অতিক্রম করার একমাত্র সেতু জ্ঞান। সে আবার ঝিনুকের মুক্তোর মতো কঠিন আবরনে ঢাকা থাকে। সে পথে অধ্যবসায়কে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
জ্ঞানেরও একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে—সে শুধু সামনে যা দেখা যাচ্ছে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকে না। সে জানতে চায়, দৃশ্যমান জগতের পিছনে কী আছে।
কার্যকে আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই। কিন্তু কারণটি অনেক সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে পর্দার আড়ালে। সেই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের আসল নাটক।
সমাজে একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে—এটুকু জানা ইতিহাসের শুরু হতে পারে; কিন্তু কেন তৈরি হয়েছিল, কীভাবে বদলাল, কার স্বার্থে শক্তিশালী হল এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল—এই প্রশ্নগুলিই ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে।
এই প্রশ্নের পথ ধরেই আমাদের যেতে হবে ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বাস্তবতার কাছে—বর্ণ ও জাতিভেদ।
মানুষ ঠিক কবে প্রথম বিশ্বজগতের রহস্য নিয়ে প্রশ্ন করেছিল, তার কোনও দিনপঞ্জি আমাদের হাতে নেই। কিন্তু সেই প্রশ্নের এক অসাধারণ কাব্যিক প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের পুরুষসূক্তে।
এখানে ‘পুরুষ’ কোনও সাধারণ পুরুষ মানুষ নন। বৈদিক ঋষিদের কল্পনায় তিনি এক মহাজাগতিক সত্তা—বিশ্বসত্তা, যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টির সম্ভাবনা নিহিত।
যিনি সৃষ্টির কেন্দ্র, তাঁরই প্রতিফলন যদি বিশ্বজগতের সর্বত্র থাকে, তবে সৃষ্টির বহুত্বের ভিতরেও নিশ্চয় কোনও একতার সূত্র আছে—এই ভাবনাই যেন পুরুষসূক্তের অন্তর্লীন সুর।
এই বলে বিভাস একটু থামলো।
চলবে ০০০০০০০০০০
কলমে - রবীন মজুমদার
২৫/০৯/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।
মন্তব্যসমূহ