৪৪৮ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৭ তম পর্ব )
৪৪৮ স্পর্ধা-আস্পর্ধা (ধারাবাহিক -২৭ তম পর্ব )
( বাস্তবের উপর দাঁড়িয়ে একটা ধারাবাহিক রচনা যা অতীত - বর্তমানে আর আগামীর আশঙ্কাকে উস্কে দেয় )
গত সংখ্যায় যা আছে - এ যেন অদ্বৈত বেদান্তের সুর বাজছে অনন্তের কেন্দ্রে । সৃষ্টির বহুত্বের ভিতরেও নিশ্চয় কোনও একতার সূত্র আছে—এই ভাবনাই যেন পুরুষসূক্তের অন্তর্লীন সুর।
২৭ তম পর্ব ........
বিভাস সহজ-সরল অনাড়ম্বরভাবে তার উপলদ্ধিতে বিভাজন প্রক্রিয়াকে বলতে লাগলো -
"- সৃষ্টি তার আপন গতিতে এই বিশ্ব চরাচরে পরিক্রমা করে, তার সাথে কেউ একাত্ম হতে পারে, আর কেউবা হতে পারে না। তাতে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার কিছু যায় আসে না।
একদিন যিনি ছিলেন সকলের অন্তরালে, যাকে দর্শনের ভাষায় বলে 'অব্যক্ত', তার এই পূর্বাবস্থা থেকে ঘনঘটা করে তার উপস্হিতি জানান দিলো অর্থাৎ তিনি ব্যক্ত হলেন। সেই অব্যক্ত থেকে ব্যক্তের যাত্রা পথে নিজেকে বহুরূপে উদ্ভাসিত করলেন। সেই একের থেকে বহুর জন্মের গল্পটা দর্শন এবং বিজ্ঞান নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছে। যে হেতু আমরা ভারতীয় দর্শনের পরিসরে দেখার চেষ্টা করছি, তাই সেই পথ ধরে চলাটাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য।
এ যেন এক খেলা। দ্রষ্টার ইচ্ছা হলো খেলা দেখবেন। তার জন্য অসঙ্খ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির দল তিনি এই বিশ্ব জুড়ে তৈরি করলেন। একের সাথে অপরের পার্থক্যকে সহজেই যাতে বোঝা যায়, তাই তিনি নাম-রূপ দিয়ে বিভক্ত করে দিয়ে ক্ষান্ত হলেন না, তার সৃষ্ট জীব যেন জন্মলগ্ন থেকে নিজের সাথে অপরের প্রভেদটা সহজেই করতে পারে, তার জন্য তার মধ্যে 'অহংভাবের' বিকাশ ঘটালেন।
প্রাণিকুল এই স্ক্রিপ্টেড খেলাটা নিজের অজান্তে খেলতে এই পৃথিবীতে আসে আর নিজ নিজ সন্তুষ্টির মাপকাঠিতে পাওনাগণ্ডা বুঝে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। কেউবা জেতে আর কেউবা হারে। মাপকাঠিটি তৈরি হয় তার মননের পরিকাঠামোর গঠন প্রণালীতে। তার পিছনে কাজ করে তার জ্ঞান ও বুদ্ধি।
ভারতীয় দর্শন বিশ্ব প্রকৃতির এই খেলাটা দীর্ঘ দিন ধরে অবলোকন করে এসেছেন। সুখী ও অসুখী মানুষের মধ্যেকার প্রভেদ চিহ্নিত করেছেন। প্রকৃতির সৃষ্ট এই বিভাজনের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্জগতের সংগ্রাম। যাকে চোখে দেখা যায় না, শুধু অনুভব করতে হয়। প্রতিনিয়ত এক ভাঙা-গড়ার খেলায় ক্লান্ত মানবকে অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার ধারাপাতগুলিকে নিয়ে আমাদের উপনিষদ। একটু দেখা যাক, উপনিষদের ভাষায় কি ভাবে ব্যাখ্যা করছেন।
অব্যক্ত অবস্থায় এক ছিলেন। তারপর তিনি ব্যক্ত হলেন, সেই একের মধ্যেই জন্ম নিল বহু।উপনিষদের ভাষায় সেই অদ্বিতীয় সত্য বহুরূপে নিজেকে প্রকাশ করল। ছান্দোগ্য উপনিষদের সেই এক থেকে বহু হওয়ার ভাবনা ভারতীয় দর্শনের গভীরে গিয়ে এক আশ্চর্য প্রশ্ন রেখে যায়—বহু কি সত্যিই বহু, নাকি বহুর ভিতরে লুকিয়ে আছে সেই এক?সাংখ্য দর্শন পুরুষকে চৈতন্য এবং প্রকৃতিকে জড় বলে ব্যাখ্যা করল। প্রকৃতির মধ্যে রইল সৃষ্টির সমস্ত সম্ভাবনা—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-র ত্রিগুণে।
বেদান্ত আবার অন্য দরজা খুলে বলল—ব্রহ্ম এক, অদ্বিতীয়, অবিকৃত; তাঁর থেকেই জগতের প্রকাশ।তারপর প্রশ্ন এল—তবে এই দৃশ্যমান বহুত্বের রহস্য কী?উত্তর এল—মায়া।মায়া মানে শুধু চোখের সামনে দেখা জগতকে অস্বীকার করা নয়; বরং পরিবর্তনশীলকে অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা। মানুষ জন্মায়, বড় হয়, বদলায়, একদিন চলে যায়। অথচ তার স্মৃতি আমাদের ভিতরে থেকে যায়।যে মানুষটি একদিন ছিল বাস্তব, তার চলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, তাকে মানতে না পারাটাই মায়া। বাস্তবতা চলে যায়, মায়া থেকে যায়।
যজ্ঞ : একের আত্মবিভাজন পুরুষসূক্তে বলা হল, সেই বিরাট পুরুষকে যজ্ঞের মাধ্যমে উৎসর্গ করার মধ্য দিয়েই বিশ্বসৃষ্টির বিভিন্ন উপাদানের প্রকাশ।কিন্তু এখানে ‘যজ্ঞ’ শব্দটিকে যদি শুধু অগ্নিকুণ্ড, আহুতি আর ধর্মীয় আচারের মধ্যে আটকে রাখা হয়, তবে এর গভীর প্রতীকী অর্থটি হারিয়ে যাবে।যজ্ঞ যেন একটি বৃহৎ প্রতীক—একটি ঐক্যবদ্ধ সমগ্রের আত্মবিভাজনের মধ্য দিয়ে বহুত্বের জন্ম।"-এই বলে বিভাস চায়ের কাপে চুমুক দিলো।
চলবে ০০০০০০০০০০
মন্তব্যসমূহ