৪১৩ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(২৮)

 ৪১৩ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে  চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে -(২৮)


১৮ই নভেম্বর' ১৮৯৪ , নিউয়র্ক থেকে  প্রেরিত পত্রের  ভাবার্থের অনুসরণে - 

প্রেমই জীবন -দ্বেষই মৃত্যু-চেতনা, সমাজ ও মানুষের মুক্তির দর্শন 

এই বিশ্ব প্রকৃতির ইতিহাস মূলত দুটি বিপরীত শক্তির ইতিহাস, মানুষের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। যেমন এর একদিকে আছে প্রেম, ঐক্য, বিস্তার আর অন্যদিকে আছে দ্বেষ,বিভাজন ও সংকোচন। সভ্যতার গতিপথ নির্ধারিত হয়েছে এই দুই শক্তির ধারাবাহিক সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে। 

তাই স্বামীজী বলেন , "প্ৰেমই জীবন, দ্বেষই মৃত্যু।" আসলে এটা নিছক কোন জ্ঞানগর্ভ  উপদেশ নয় বরং তিনি মানব অস্তিত্বের এক গভীর দার্শনিক সত্যকে প্রকাশ  করেছিলেন এই চিঠিতে। 

জড়ের সাথে চৈতন্যের গুনগত পার্থ্ক্য 

চেতনা নেই বলে সেই জগতকে  জড় জগৎ বলা হয়।  জড় জগতে ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর ভিন্ন ভিন্ন ক্রিয়া আছে। বস্তু ধর্ম অনুযায়ী এক বস্তু অপর বস্তুর সাথে মিলিত হতে পারেনা, তাই তারা আলাদা সত্ত্বা হিসাবে এই পৃথিবীতে পরিচিত। এর পশ্চাতের কারণ হচ্ছে চৈতন্যের অভাব। অথচ , এই বিশ্ব চরাচরে উন্নত জীব মানুষ, কেননা, তার চৈতন্য আছে। সে যখন জড়ের মতো আচরণ করে, তখন তার চেতনার অভাব পরিলক্ষিত হয়ে সে স্বতন্ত্রতাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকে, সব ধরনের প্রাকৃতিক নিয়মকে অগ্রাহ্য করে কিংবা অজ্ঞানতার কারণে। 

জাতিগণ সমাজের অঙ্গপ্রতঙ্গ 

একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গের সমাহার এবং তারা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। ঠিক তেমনি সমাজটাও ভিন্ন ভিন্ন জাতির সমাহারে গড়ে ওঠে।  সেখানে মানুষ যদি এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তাহলে কোনো এক বা একধিক  অঙ্গের নিঃসঙ্গতায় তার যেমন পঙ্গুত্ব প্রাপ্তি ঘটে , ঠিক সেই রূপ সমাজেও অপূর্নতা প্রাপ্তি ঘটে।  এইটা সহজেই অনুমেয় যে , অংশ কখনো সমগ্রের সমান হতে পারেনা। 

অদ্বৈতবাদের  ধারণা ও তার সত্যতা 

উপনিষদের দর্শনে বলা হয়েছে, বহুত্বের অন্তরালে একত্বই চরম সত্য। আমরা বাহ্যিকভাবে ভিন্ন হলেও অস্তিত্বের গভীরে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। এই কারণেই প্রেম মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। প্রেম মানুষের চেতনাকে প্রসারিত করে, আর দ্বেষ তাকে সংকুচিত করে। প্রেমের মধ্যে রয়েছে আত্মবিস্তার, দ্বেষের মধ্যে রয়েছে আত্মসংকোচন। যে মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ, নিজের গোষ্ঠী কিংবা নিজের পরিচয়কে সর্বস্ব মনে করে, সে ধীরে ধীরে নিজের চারপাশে অদৃশ্য প্রাচীর নির্মাণ করে। এই প্রাচীর তাকে অন্যদের থেকে যেমন বিচ্ছিন্ন করে, তেমনি তার নিজের অন্তরকেও সংকীর্ণ করে তোলে।

ভারতীয় সংস্কৃতির ধারা 

"নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান "- এই হচ্ছে ভারতবর্ষ। যুগে যুগে এই স্বর্গে বহুজাতি তাদের আচার-আচরণ, ভাষা, ধর্ম, বেশভুষাকে সম্বল করে ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সেখানে না ছিল ভেদবুদ্ধি, না ছিল জাত্যাভিমান।  যেদিন থেকে এই নিরহঙ্কারী ভুমিতে  পতিত হলো অহংকার ও সামাজিক সঙ্কীর্ণতার বীজ, সেই বীজ অমর অঙ্কুরে বিকশিত হয়ে কলুষিত করলো সমাজের প্রাণশক্তিকে। 

সমাজ দুর্ব্বল হবার কারণ 

স্বামী বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন যে, যে জাতি অন্যকে ঘৃণা করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই দুর্বল করে। কারণ প্রকৃতির মৌলিক নিয়মই হলো আদান-প্রদান। সমুদ্র বাষ্প দেয়, মেঘ বৃষ্টি দেয়; বৃক্ষ ফল দেয়, মানুষ তার ছায়া ও খাদ্য গ্রহণ করে। জীবন সর্বত্র বিনিময়ের মাধ্যমে বিকশিত হয়। যে ব্যক্তি বা সমাজ কেবল গ্রহণ করতে চায়, কিন্তু দিতে চায় না, সে প্রকৃতির এই চিরন্তন নিয়মের বিরোধিতা করে।

এই পত্রে স্বামীজি  ভারতবর্ষের মতো সংস্কৃতির উচ্চাসনে বসে থাকা একটি দেশের অধঃপতনের কারণ উপলদ্ধি করে আরো বলেন - সমাজপতিরা শুধু মাত্র বিভাজনের সংস্কৃতিতে সমাজকে  ভাসিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হননি, এর সাথে তারা আচারের  বেড়া দিয়ে বিভাজনের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ করে ছিলেন।  বিভাজন যদি  কার্য্য হয়, তাহলে তার পিছনের কারণ হচ্ছে ঘৃণা। 

অন্ধত্বতা 

যখন থেকে কিছু স্বার্থন্বেশী মানুষ প্রকৃতির এই অলঙ্ঘনীয় বিনিময় প্রথাকে অস্বীকার করে  ধীরে ধীরে সমাজে বিভাজনকে প্রতিষ্ঠিত করে মুনাফা অর্জন করতে শুরু করলো, সেদিন থেকে সাধারণ মানুষের অন্তর বিভাজনের বিষে আক্রান্ত হয়ে প্রেমের অকাল মৃত্যু ঘটিয়ে কুসংস্কার আর স্বার্থপরতা  বীরদর্পে এই সমাজে রাজত্ব করতে লাগলো। 

গাছ আর আগাছা সমান্তরাল ভাবে এই প্রকৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে কিংবা  বলা যেতে পারে , প্রকৃতি গ্রহণ করে নিয়েছে। কিন্তু মানুষ বসবাস করার  জন্য  গাছ থেকে আগাছার সীমারেখা চিহ্নিত করে দিয়েছে। তাই স্বামীজী আহবান করেছেন সমগ্র জাতিকে হৃদয়ের দ্বারকে উন্মোচিত করে জাতি-ধর্ম  নির্বিশেষে শুধুমাত্র মানুষ পদবাচ্যকে সেখানে স্থান দিতে। তাতেই জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকা কতিপয় মনুষ্যসৃষ্ট ভেদাভেদের জালকে চূর্ন করে হৃদয়কে অনন্তের দিকে প্রসারিত করার মধ্যে দিয়ে উচ্চারিত হবে মানবতাকে সবধরনের বাঁধন থেকে  মুক্তির সোপান।   অন্তরের এই স্বাধীনতা থেকেই  উচ্ছাসিত হবে অপরকে স্বাধীনতা দেবার বাসনা আর সেখান থেকে আগামী হয়ে উঠবে আগাছাহীন সমাজ। 

স্বামী বিবেকানন্দের বাণীর গভীর তাৎপর্য এখানেই—প্রেম জীবনকে বিস্তৃত করে, আর দ্বেষ তাকে সংকুচিত করে। প্রেম মানুষকে অনন্তের দিকে নিয়ে যায়, আর ঘৃণা তাকে নিজের নির্মিত অন্ধকারে বন্দি করে। তাই প্রেমই জীবন, দ্বেষই মৃত্যু।

চলবে -

লেখনীতে -রবীন মজুমদার 
তারিখ -  ০৯/০৬/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে। 
২০০


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)