৪৫০ দর্শনের অদর্শন

৪৫০   দর্শনের অদর্শন  
কত শব্দকে বিনা বিচারে মনের কুলঙ্গিতে লুকিয়ে রেখেছি। তারা মনের অন্দরে নির্বোধ শিশুর মতো ডুগডুগি বাজিয়ে আসছে। জীবন সাহাহ্নে  এসে এক এক করে তাদের বের করে বিচার বিশ্লেষণ করতে বসেছি। যে অবলা মাধ্যমটি এব্যাপারে একটা পেয়াদার মতো  বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে তার নাম শুধুই দর্শন অর্থাৎ দেখা। যে চোখ দিয়ে দেখি, সে নেহাত গোবেচারা , তাকে যদি আঙ্গুল দিয়ে অক্ষর চেনানো না হয়, তাহলে সে কিছুই বুঝবেনা। তাই সে যা পায় আর যা দেখে তাকেই ধরে নিয়ে আসে মনের কাছে , বাছ বিচারের বালাই নেই। সদাই ব্যস্ত মন, সেখানে চোখের ভালোলাগার সাথে মনের ভালোলাগার বিরাট পার্থক্য। মনপুত না হলে ওয়েটিং লিস্টে পরে থাকে। আর এই মনপ্রাণ দিয়ে দেখাকে যে  'দর্শনশাস্ত্র বলে সেটা জানতাম না।  
পন্ডিতরা তাই সামনে একটা তকমা লাগিয়ে খোলসা করে আকারে বড়মাপের দেখাকে  বলে স্থুল দর্শন, আর সেই দর্শনকে রসায়নাগারে পরীক্ষানিরীক্ষা করার পরে যে উত্তরটি পাওয়া যায়,  তার নামের আগে সুক্ষ শব্দটি বসিয়ে দেয়।
সারা জীবন ধরে মানুষ কোন সম্পর্ককে শুধু দেখেই যায় কিন্তু  চিনতে পারেনা - সেটা শুধুই দেখা বা সাধারণ দর্শনের  পর্য্যায়ে পরে। দেখা আর জানার সাথে ভাব ভালোবাসা আছে না তফাৎ আছে, সেটা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে। সবাই সিনেমা বা নাটকের সমালোচক হতে পারেন না, লক্ষ মানুষের মধ্যে স্বল্প কিছু মানুষ হয় আর বাকি সব দর্শক। 
শুধ রূপ দেখে ঠকে যাবার অভিজ্ঞতা বহু মানুষের আছে। আর  এই প্রশ্ন যখন কোন দার্শনিকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন নানা রকমের জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ঐ সমস্যাই  আসলে দর্শন চিন্তার জননী। 
আবার যদি পাড়ার বাবলুদার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, সে তো সব সময় বলে -" ঐ যে অল্প বয়সে তোর বৌদিকে দেখলুম , তারপর সেটা যে আমার জীবনের  কাল হল, সেটা বুঝতে বুঝতে ৬০টা বসন্ত পার হয়ে গেলো। বুঝলিনা, সবই তো চোখের দেখার ভুল।  একটা ইন্দ্রিয়ের ভুলের মাশুল গুনতে হচ্ছে একটা পূর্ণাঙ্গ  দেহকে, তাও আবার এতদিন ধরে।  সবই যোগ-বিয়োগের  ভুল, বুঝলি হরেন । দেখা আর জানার মধ্যে বিস্তর ফারাক। " 
পঁচিশ বছরের হরেনের  এই কথাটা মনে বেশ ধরে গেলো। মনে মনে ভাবলো, এই দেখবার মানে দর্শনের এই বৈচিত্রটাকে জানতেই হবে। এই ভেবে একদিন  হরি মাস্টারের কাছে দর্শনের পাঠ নিতে তার স্পেশাল কোচিন ক্লাসে  ভর্তি  হলো। 
হরিবাবু যারপরনাই খুশি হলেন  অল্পবয়সীদের মধ্যে দর্শনের মতো একটা জটিল  বিষয়কে জানবার  আগ্রহ দেখে। তবে, তিনি বুঝলেন এই বিষয়টি তাদের মতো  করেই আলোচনা করলে, আগ্রহ বাড়বে। 
প্রথম দিনই  হরি মাস্টার বললেন,  " তোমার আমার  সম্পর্কটা যদি  ছাত্র ও শিক্ষক পরিচয়ের মধ্যে আটকে না রেখে বন্ধুর মতো  দরাজ হয়ে আড্ডার ঢঙে যদি আলোচনা চলে, তাহলে প্রশ্ন  করার বাধাগুলি আমরা দুজনেই টপকাতে পারবো। " 
 হরি মাস্টার বললেন , একটা গল্প বলি শোন -" পথে পথে যেতে যেতে , একটা লাল রঙের গোলাপ ফুলের বাহারি বাগান দেখলাম। আগে গোলাপ ফুল দেখেছিলাম বলে, ফুলটিকে চিনলাম  গোলাপ বলে। এবার চলো, এই প্রথমে দেখা তারপরে চেনা - এই বিষয়টাকে  নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করি।  
প্রথম দর্শনে গোলাপ তার অপরূপ সৌন্দর্যে আমার হৃদয়কে স্পর্শ  করে ফেললো।  চোখের উপর বহু সাধারণমানের দৃশ্যের  সাথে  পথে দেখা হয়েছিল, তারা কেউ আমার দৃষ্টিকে স্পর্শ করতে  পারেনি।  যেইনা চোখ গোলাপকে দেখলো, সঙ্গে সঙ্গে চোখের  উপর ওর লাল রঙের অপূর্ব ছটা যেন এঁকে দিলো। ব্যাস! আর যায় কোথায়, প্রথমে হৃদয়ের দখল নিলো। এবার আমি বেশ বুঝতে পারছি , অনুভূতির হাত ধরে সেই লাল রঙের  ছাপটা সেই সুক্ষ  শিরা-উপশিরা বেয়ে মাথার মধ্যে কি এক তীক্ষ্ণ  ঝিলিক সৃষ্টি করলো  আর সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেলো মনের কঠিন দরজাটা।  মন সেই স্পন্দনকে আঁকড়ে জড়িয়ে  ধরলো। 
প্রত্যেক দিন  মনের উপযুক্ত আহার জোটেনা। আজ জুটলো, তন্ত্রীতে  বেজে ওঠা সুরের সাথে চৈতন্যের ঘরের আলো জ্বলে উঠলো, সেই  সংবাদ আর  অন্তঃপুরের মধ্যে গোপন রইলোনা।  সুরের সাথে চৈতন্যের মিলনের  ছটা  এসে প্লাবিত করলো আমার কাছে।  আমার সাথে পরিচয় হলো  সেই লাল গোলাপের। "
"এই গল্প দিয়ে ওই দর্শনের পিছনের দর্শনের কথা বললাম। যেটা বলতে চাইলাম , সেটা হলো ঐ চৈতন্যই হল প্রকৃত দর্শনের প্রাণকেন্দ্র আর বাদবাকি সব  জড়বস্তু। ওই চোখসহ সব ইন্দ্রিয় এবং মন  জড়।  যন্ত্রের পিছনের য্ন্ত্রীই হল চৈতন্য। "

আবার কালকে ০০০০০০০০০০

কলমে - রবীন মজুমদার 
০৪/১০/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)