৪৫৭ লুকোচুরি খেলা

 ৪৫৭ লুকোচুরি খেলা 

 


লুকোচুরি অতি প্রাচীন খেলা। পৃথিবীতে মানুষের জন্মের আগে থেকেই বোধ হয় এই খেলার প্রচলন ছিল। অন্তত পশুপাখিদের দেখে তেমনই মনে হয়। বাঘ শিকারের আগে আড়ালে থাকে, হরিণ তাকে দেখতে পায় না। তারপর হঠাৎ বাঘের আবির্ভাব। হরিণের তখন আর খেলার মেজাজ থাকে না। সে বুঝতে পারে, খেলাটা নিছক খেলা ছিল না।

এইখান থেকেই লুকোচুরি খেলার দুটি শাখা আবিষ্কার করা যেতে পারে—নিরামিষ ও আমিষ।

মানুষ সাধারণত নিরামিষ লুকোচুরি খেলে। যেমন, ছোটবেলায় বন্ধুরা চোখ বুজে একশো পর্যন্ত গুনছে, আর অন্যরা কেউ খাটের তলায়, কেউ আলমারির পিছনে, কেউ বা গাছের ডালে উঠে বসে আছে। ধরা পড়লে বড়জোর কিছুক্ষণ মুখ ভার করে থাকা। তারপর আবার খেলা শুরু।

কিন্তু বয়স বাড়লে খেলাটির চরিত্র বদলে যায়। তখন আর কেউ গাছে ওঠে না, আলমারির পিছনেও লুকোয় না। মানুষ লুকোয় নিজের স্বভাব, নিজের অভ্যাস, নিজের আয়-ব্যয়, এমনকি নিজের বিবেকটিকেও।

বিবেক অবশ্য খুব সুবিধের জিনিস নয়। তাকে যতই লুকিয়ে রাখা হোক, মাঝেমধ্যে এমন সব শব্দ করে ওঠে যে পাশের ঘরের লোকও শুনতে পায়।

আমাদের পাড়ায় মেজো ছেলেটি খুব ভালো ছেলে বলে পরিচিত। সকালে মন্দিরে যায়, বিকেলে ক্লাবের চাঁদা দেয়, পাড়ার বৃদ্ধদের দেখলে প্রণাম করে। কিন্তু রাতের দিকে তার কিছু বিশেষ সামাজিক কর্তব্য আছে, যেগুলি সে গোপনে পালন করে। এই গোপন কর্তব্যগুলির কথা পাড়ার লোক জানে না, জানলেও জানে না বলে ভান করে।

একদিন মিন্টুর মোবাইলে কয়েকটি ছবি উঠে গেল। ছবিগুলি কারও অনুমতি নিয়ে উঠেছিল কি না, সে অন্য প্রশ্ন। কিন্তু ছবিগুলি যখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল, তখন মেজো ছেলেটির সামাজিক জীবন প্রায় শেষ।

যে পাড়ায় গতকালও তাকে আদর্শ সন্তান বলা হতো, আজ সেই পাড়াতেই তার নাম উচ্চারণ করা হচ্ছে ফিসফিস করে। তার বাবা বাজারে গিয়ে মাছ কিনতে পারছেন না, কারণ মাছওয়ালা পর্যন্ত ছবিটি দেখেছে। মা আত্মীয়বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেছেন। আর মেজো ছেলে বুঝতে পারল, লুকোচুরি খেলায় সবচেয়ে বড় বিপদ লুকোনো নয়—ধরা পড়ে যাওয়া।

তবে এ কথা বলা অন্যায় হবে যে, শুধু মেজো ছেলেই লুকোচুরি খেলে। সংসারের ছোটখাটো খেলোয়াড়দের সঙ্গে বড় খেলোয়াড়দের পার্থক্য আছে। ছোট খেলোয়াড়ের হাতে থাকে মোবাইল, বড় খেলোয়াড়ের হাতে থাকে মাইক্রোফোন।

ছোট খেলোয়াড়ের ছবি ভাইরাল হয়। বড় খেলোয়াড়ের বক্তব্য ভাইরাল হয়।

ছোট খেলোয়াড় ধরা পড়লে পাড়ার লোক বিচার করে। বড় খেলোয়াড় ধরা পড়লে বিচার শুরু হয় টেলিভিশনের পর্দায়। সেখানে একদল বলেন, তিনি নির্দোষ; আর একদল বলেন, তিনি শুধু নির্দোষ নন, তাঁর মতো নির্দোষ মানুষ পৃথিবীতে আর জন্মাননি। মাঝখানে যে প্রশ্নটি থাকে, সেটি ক্রমশ ছোট হতে হতে একসময় বিজ্ঞাপনের বিরতিতে হারিয়ে যায়।

রাজনীতিতে লুকোচুরি তাই একটি অত্যন্ত উন্নত শিল্প। এখানে লুকোনোর জন্য আলমারি লাগে না, লাগে বিবৃতি। গাছের আড়াল লাগে না, লাগে কমিটি। আর ধরা পড়ে গেলে লাগে একটি তদন্ত, যার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগে তদন্তকারীদেরই অবসর গ্রহণের বয়স হয়ে যেতে পারে।

এমন নয় যে রাজনীতিতে সবাই মিথ্যে বলেন। কেউ কেউ সত্য কথাও বলেন। তবে সত্য কথাটি কখন বলতে হবে, কতখানি বলতে হবে এবং বলার পরে কোন দিকে তাকাতে হবে—এই তিনটি বিষয়ে তাঁদের অসাধারণ দক্ষতা থাকে।

এবার আসা যাক দিল্লির কথায়।

দিল্লি এমন একটি জায়গা, যেখানে লুকোচুরি খেলতে গেলে জায়গার অভাব হয় না। ইতিহাসের আড়াল আছে, প্রশাসনের আড়াল আছে, আইনের আড়াল আছে, আর আছে পরিসংখ্যানের এক বিরাট জঙ্গল। সেখানে একটি সংখ্যা হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। সংখ্যাটির নাম নাগরিক, ভোটার, কিংবা অধিকার—যাই হোক না কেন।

ধরা যাক, দেশের কয়েক কোটি মানুষ হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, তাঁরা যে দেশে জন্মেছেন, যে দেশে তাঁদের বাবা-মা জন্মেছেন, যে দেশের মাটিতে তাঁরা এতকাল ঘরবাড়ি বানিয়ে সংসার করেছেন, সেই দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁদের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

তাঁরা প্রথমে ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোথাও কাগজপত্রের ভুল হয়েছে। তারপর তাঁরা কাগজ খুঁজলেন। পুরোনো বাক্স খুললেন। বাবার দলিল, মায়ের শংসাপত্র, দাদুর নাম লেখা খাতা—যা পাওয়া যায় সব বার করলেন।

কিন্তু কাগজেরও একটা আশ্চর্য স্বভাব আছে। মানুষের জীবনে সে যতদিন প্রয়োজনীয় নয়, ততদিন দিব্যি হারিয়ে থাকে। আর যেদিন তাকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করতে হয়, সেদিন সে এমনভাবে আত্মগোপন করে যেন সেও লুকোচুরি খেলছে।

এদিকে যাঁরা খেলাটির নিয়ম তৈরি করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বলেন, নিয়ম সকলের জন্য সমান। কথাটি শুনতে খুব ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হল, সবার কাছে কি সমান কাগজ আছে? সবার কি একই রকম শিক্ষার সুযোগ ছিল? সবার কি একই রকম নিরাপদ জীবন ছিল?

একজনের পূর্বপুরুষের দলিল লোহার সিন্দুকে রাখা। আর একজনের পূর্বপুরুষের স্মৃতি শুধু গ্রামের লোকের মুখে মুখে। একজনের কাছে নথির পাহাড়, অন্যজনের কাছে পুরোনো একটি বিবর্ণ ছবি। এখন যদি দুজনকে একই প্রশ্ন করা হয়, প্রশ্নটি দেখতে সমান হলেও তার ভার কি সমান থাকে?

জঙ্গলে বাঘ ও হরিণের জন্য একই নিয়ম করা যেতে পারে। কিন্তু বাঘের দাঁত আর হরিণের দৌড়কে সমান বলা যায় না।

আর নাগরিকত্বের প্রশ্নটি তো সাধারণ খেলা নয়। এখানে কাউকে খুঁজে পাওয়া আর কাউকে হারিয়ে ফেলার মধ্যে বিস্তর তফাত। কারণ নাগরিকত্ব শুধু একটি কাগজ নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, পরিচয় এবং গণতন্ত্রে অংশ নেওয়ার মর্যাদা।

বিশেষত ভোটাধিকার। যে অধিকার দিয়ে একজন সাধারণ মানুষ শাসককে প্রশ্ন করতে পারেন, পাঁচ বছর পরে বিদায় জানাতে পারেন, সেই অধিকার নিয়ে কোনও অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিষয়টি আর নিরামিষ থাকে না। গণতন্ত্রের থালায় তখন আমিষের গন্ধ পাওয়া যায়।

অবশ্য এখানে একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার। কোনও নির্দিষ্ট নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় সত্যিই কতজন মানুষের নাম বাদ পড়েছে, কতজনের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং কতজনের ভোটাধিকার হারানোর ঘটনা ঘটেছে—এসবের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি নথি ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। শুধু অভিযোগ শুনে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। কিন্তু মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চাওয়াও গণতন্ত্রেরই অংশ।

আমাদের দেশে খেলাধুলার খুব কদর। ক্রিকেটে কেউ ক্যাচ ফেললে দর্শক চিৎকার করেন। ব্যাটসম্যান আউট হলে কেউ কেউ টেলিভিশন বন্ধ করে দেন। কিন্তু নাগরিকের অধিকার নিয়ে যখন টানাটানি হয়, তখন অনেকেই ভাবেন, এ তো অন্যের খেলা। আমার নাম তো তালিকায় আছে!

এইখানেই লুকোচুরি খেলার আসল মজা। যে লুকোচুরি আজ অন্যের সঙ্গে হচ্ছে, কাল সেটি নিজের সঙ্গে হতে পারে। আজ আপনি দর্শক, কাল আপনিই খেলোয়াড়। আজ আপনি বাঘের পাশে দাঁড়িয়ে হরিণকে দেখছেন, কাল বাঘটি আপনাকেও অন্য কোনও প্রাণী ভেবে বসতে পারে।

তাই রাজনীতির লুকোচুরি খেলায় একটি নতুন নিয়ম থাকা উচিত। যে লুকোবে, সে লুকোতে পারে; কিন্তু তার হাতে যেন অন্যের অধিকার লুকিয়ে ফেলার ক্ষমতা না থাকে। যে খুঁজবে, তাকেও বলতে হবে সে কী খুঁজছে। আর যে ধরা পড়বে, তার বিচার হবে প্রমাণে—চিৎকারে নয়, প্রচারে নয়।

খেলাটির নাম লুকোচুরি হলেও গণতন্ত্রের নিয়মটি হওয়া উচিত প্রকাশ্য।

শেষে একটা কথা। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলতে গিয়ে আমরা সবাই চাইতাম, অন্যরা যেন আমাদের খুঁজে না পায়। বড় হয়ে বুঝলাম, জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক লুকোচুরি সেটি নয়, যেখানে আমরা লুকিয়ে থাকি।

বিপদ তখনই, যখন যারা লুকিয়ে আছে তাদের খোঁজার কথা, তারাই অন্যদের চোখ বুজিয়ে দিয়ে বলে—

“তোমরা সবাই লুকিয়ে পড়ো। এবার আমরা গণতন্ত্রের খেলা শুরু করছি!”

কলমে - রবীন মজুমদার 

২2/১০/২৬
যদি একমত হন, তবে বেশী বেশী করে সবার কাছে শেয়ার করুন 
rabinujaan.blogspot.com থেকে অন্যান্য ব্লগগুলি পড়া যাবে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

৩৬৪ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১১)

৩৬৬ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১৩)

৩৬৫ কেন আজ স্বামীজিকে নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজনীয়তা আছে - (১২)