৪৫৯ প্রেম বনাম গ্যাস চেম্বার
৪৫৯ প্রেম বনাম গ্যাস চেম্বার
ইতিহাস যখন মৃত্যুর পরোয়ানা লেখে, প্রেম তখনও চিঠি লেখে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে প্রেমের দাম বেড়ে যায়।
অবশ্য তখন প্রেম করার মতো অবস্থা থাকে না। চারদিকে বোমা পড়ছে, রাস্তায় ট্যাঙ্ক চলছে, রেডিওতে নেতারা গলা ফাটিয়ে জাতির গৌরব ঘোষণা করছেন। এমন সময়ে প্রেমিক যদি প্রেমিকাকে বলে, ‘তোমার চোখ দুটো কী সুন্দর’, মেয়েটি স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞাসা করবে, ‘তোমার মাথাটা কি ঠিক আছে? আমাদের বাড়ির ছাদটা এইমাত্র উড়ে গেল!’
তবু প্রেম হয়।
হয়তো এই কারণেই মানুষের ইতিহাসে যুদ্ধের সংখ্যা যত বেড়েছে, প্রেমের গল্পের সংখ্যাও তত কমেনি।
১৯৩৮ সালের বার্লিন।
শহরটার চেহারা তখন বদলে যাচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় পতাকা, দেওয়ালে দেওয়ালে স্লোগান, বক্তৃতার মঞ্চে উত্তেজিত মুখ। জার্মানির মানুষকে বোঝানো হচ্ছে, তাদের দুর্দশার জন্য দায়ী কিছু নির্দিষ্ট মানুষ। ইতিহাসের এই পুরোনো কৌশলটি বেশ কার্যকর—নিজের ঘরের আগুন নেভাতে না পারলে প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দাও। তারপর সবাই মিলে আগুনের শিখা দেখে জাতীয় গৌরব অনুভব করো।
অ্যাডলফ হিটলার তখন জার্মানির ক্ষমতার কেন্দ্রে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজয়, অপমান, অর্থনৈতিক বিপর্যয় আর জনতার ক্ষোভকে পুঁজি করে তাঁর উত্থান। একসময়ের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দ্রুত পরিণত হচ্ছে একনায়কতন্ত্রে। ইহুদিদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছেন মানুষ, স্কুল-কলেজের দরজা ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে।
রাষ্ট্রের হাতে যখন ক্ষমতা থাকে, তখন অন্যায়ও অনেক সময় সরকারি পোশাক পরে আসে।
বার্লিনের এক পুরোনো বাড়ির তিনতলায় থাকত ড্যানিয়েল রোজেন। বয়স আটাশ। পেশায় বইয়ের দোকানের কর্মচারী, শখে কবিতা লেখে, আর দুর্ভাগ্যবশত জন্মসূত্রে ইহুদি।
শেষের পরিচয়টাই তখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড্যানিয়েলের বাবা একদিন বলেছিলেন, ‘মানুষের পরিচয় তার চরিত্রে।’
ড্যানিয়েল মনে মনে ভেবেছিল, কথাটা খুব সুন্দর। কিন্তু বাবা যদি একটু আগে জন্মাতেন, তাহলে হয়তো বুঝতেন—পৃথিবীতে এমন সময় আসে যখন চরিত্রের সার্টিফিকেট দেখিয়ে লাভ নেই, জন্মের শংসাপত্রই যথেষ্ট।
ড্যানিয়েলের প্রেমিকা এলিজাবেথ। জার্মান পরিবারের মেয়ে। বাবা সরকারি দপ্তরে চাকরি করেন, মা পিয়ানো বাজান, আর মেয়েটি এমন সব প্রশ্ন করে যার উত্তর দিতে গিয়ে বাড়ির ভদ্রলোকদের চশমা খুলে কপাল মুছতে হয়।
যেমন একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বাবা, একজন মানুষকে শুধু সে ইহুদি বলে ঘৃণা করা যায়?’
বাবা খবরের কাগজ নামিয়ে বলেছিলেন, ‘রাজনীতির ব্যাপারে তোমার এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।’
এলিজাবেথ বলেছিল, ‘তা হলে মানুষকে ভালোবাসার ব্যাপারেও তোমার এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।’
সেদিন থেকে বাবা মেয়ের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সংসারে শান্তি ফিরেছিল। তবে শান্তির কারণটা যে জ্ঞানের উন্নতি নয়, কথোপকথনের অবসান—সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।
ড্যানিয়েলের সঙ্গে এলিজাবেথের পরিচয় একটি বইয়ের দোকানে। এলিজাবেথ রবীন্দ্রনাথের জার্মান অনুবাদ খুঁজছিল। ড্যানিয়েল বইটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘প্রেমের বই খুঁজছেন?’
এলিজাবেথ বলেছিল, ‘আপনি কী করে বুঝলেন?’
‘যাঁরা দর্শনের বই খোঁজেন, তাঁরা সাধারণত বইয়ের নাম বলেন। যাঁরা প্রেমের বই খোঁজেন, তাঁরা দোকানদারের মুখের দিকে তাকান।’
কিন্তু রাষ্ট্রের জানালায় তখন লোহার শিক বসানো হচ্ছে।
একদিন ড্যানিয়েলের দোকানে সরকারি নির্দেশ এল। ইহুদি মালিকানাধীন ব্যবসার ওপর চাপ বাড়ছে। ক্রেতারা আসা বন্ধ করল। পরিচিত লোকেরা রাস্তার ওপারে চলে গেল। কেউ কেউ চোখ নামিয়ে নিল।
মানুষের চোখ নামিয়ে নেওয়ার মধ্যে একটা বিশেষ নিষ্ঠুরতা আছে। যে মানুষটি গতকাল তোমার সঙ্গে চা খেয়েছে, আজ সে তোমাকে দেখে অন্যদিকে তাকায়। তোমার অপরাধ কী, সে জানে না। কিন্তু তোমার সঙ্গে দেখা গেলে তার নিজের অসুবিধা হতে পারে—এই জ্ঞানটুকু তার যথেষ্ট।
‘আগে ভাবতাম, তোমাকে সুখী করার মতো কিছু একটা করব। এখন বুঝেছি, তোমাকে হারানোর আগে তোমাকে নিজের বলতে চাই।’
এলিজাবেথ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো, না ভয় পাচ্ছ?’
ড্যানিয়েল জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তায় কয়েকজন বাদামি পোশাকের লোক হাঁটছিল।
‘দুটোই।’
‘ভয় পেলে মানুষ বিয়ে করে?’
‘কেউ কেউ বিয়ে করে। কেউ কেউ দেশ ছাড়ে। কেউ কেউ নেতা হয়।’
এলিজাবেথ বলল, ‘নেতা হওয়ার পরিকল্পনাটা বাদ দাও। তোমার বক্তৃতা শুনে মানুষ ঘুমিয়ে পড়বে।’
ড্যানিয়েল হেসে ফেলল। বহুদিন পর সেই হাসি তার নিজের বলে মনে হল।
কিন্তু বিয়ের কথা ভাবলেই সমস্যার তালিকা বেরিয়ে পড়ত। ধর্মীয় পরিচয়, পরিবারের আপত্তি, আইনের ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে প্রেমের খাতায় হিসাবের খাতা ঢুকে পড়ল।
মানুষ যখন ভালোবাসে, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কবিতা লেখে। আর যখন বিয়ে করতে যায়, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাবরক্ষক নিয়োগ করে।
এক রাতে এলিজাবেথ একটি চিঠি নিয়ে এল।
‘আমার এক আত্মীয়ের সাহায্যে তোমার ইংল্যান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা হতে পারে,’ সে বলল।
ড্যানিয়েল চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
‘তুমি যাবে?’
‘তুমি যাবে।’
‘আমরা?’
এলিজাবেথ এবার একটু জোর দিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে দেশ ছাড়তে বলছি, আমাকে নয়।’
ড্যানিয়েল তার হাত ধরল। ‘তোমার পরিবার?’
‘আমার পরিবার মনে করে, আমি তোমাকে ভালোবাসলে জার্মানির ক্ষতি হবে।’
‘জার্মানির সঙ্গে আমার এত শত্রুতা নেই।’
‘আমারও নেই। কিন্তু জার্মানি যদি আমাকে তোমাকে ভালোবাসতে না দেয়, তা হলে জার্মানির সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।’
সেই কথাগুলো বলার সময় এলিজাবেথের গলায় কোনও বক্তৃতার জোর ছিল না। ছিল এমন এক দৃঢ়তা, যার সামনে বড় বড় পতাকাও কখনও কখনও কাগজের টুকরোর মতো দেখায়।
১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর।
জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করল। শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
যুদ্ধের ঘোষণায় রেডিওর কণ্ঠস্বর ছিল গম্ভীর। রাষ্ট্র জানিয়ে দিল, জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ড্যানিয়েল ভাবল, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষের অস্তিত্বটাই যদি আগে কেড়ে নেওয়া হয়, তা হলে রাষ্ট্রটা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করবে কাকে?
তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কেউ ছিল না।
এদিকে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠল। পরিচয়পত্র, চলাফেরা, সম্পত্তি, কাজ—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে গেল। পরে নাৎসিদের পরিকল্পিত গণহত্যা ইউরোপের ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে এল। লক্ষ লক্ষ মানুষকে বন্দিশিবির ও হত্যাকেন্দ্রে নির্বাসিত করা হল; প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়েছিল।
ইতিহাসে সংখ্যাগুলো লিখতে সুবিধা হয়। ছয় লক্ষ, ষাট লক্ষ, কয়েক কোটি।
কিন্তু একটি সংখ্যার কোনও মা থাকে না, কোনও প্রেমিকা থাকে না, কোনও অসমাপ্ত চিঠি থাকে না। একটি সংখ্যা কখনও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে জিজ্ঞাসা করে না, ‘তুমি ফিরবে তো?’
মানুষের সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বোধ হয় এই যে, মানুষকে মেরে ফেলার আগে তাকে সংখ্যা বানিয়ে নেওয়া যায়।
ড্যানিয়েল শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে যাওয়ার কাগজ পেল। কিন্তু এলিজাবেথের যাওয়া হল না। তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, পরিবারে নানা বাধা, আর সীমান্ত পেরোনোর ব্যবস্থা প্রতিদিন কঠিন হচ্ছে।
স্টেশনে বিদায়ের দিন এলিজাবেথ বলল, ‘তুমি আমাকে ভুলে যেয়ো না।’
ড্যানিয়েল বলল, ‘এত কঠিন কাজ তুমি আমাকে করতে বলছ কেন?’
‘কারণ তুমি কবিতা লেখো। কবিরা নাকি সব ভুলে যায়।’
‘কবিরা ছন্দ ভুলে যায়, মানুষ নয়।’
এলিজাবেথ তার কোটের পকেটে একটা ছোট্ট কাগজ গুঁজে দিল। তাতে লেখা—
যদি পৃথিবী তোমাকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, তবে পৃথিবীকে বোলো, আমি এখনও রাজি নই।
ট্রেন ছাড়ল।
ড্যানিয়েল জানালার ধারে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে লাগল। এলিজাবেথ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইল যতক্ষণ না ট্রেনটা চোখের আড়াল হয়ে গেল।
তারপর বাড়ি ফিরে মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাঁদছিলি?’
এলিজাবেথ বলল, ‘না।’
‘চোখ লাল কেন?’
‘ধোঁয়া।’
মা বললেন, ‘স্টেশনে তো ধোঁয়া থাকবেই।’
মেয়ের কান্নার এমন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুনে তিনি আশ্বস্ত হলেন।
সংসারে অনেক সময় সত্যকে মিথ্যে দিয়ে ঢাকতে হয় না। একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাই যথেষ্ট।
ইংল্যান্ডে পৌঁছে ড্যানিয়েল নতুন জীবন শুরু করল। সে একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থায় কাজ পেল। সন্ধ্যায় অনুবাদ করত, রাতে চিঠি লিখত।
চিঠিগুলো এলিজাবেথের কাছে পৌঁছত কি না, সে জানত না। তবু লিখত।
‘আজ বৃষ্টি হয়েছে। তোমার কথা মনে পড়ল।’
‘আজ এক বৃদ্ধা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কোথাকার লোক। আমি বললাম, বার্লিনের। তিনি বললেন, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি জার্মান। আমি বললাম, জন্মসূত্রে। তিনি বললেন, তা হলে জার্মানির জন্য তোমার মন খারাপ করে না? আমি উত্তর দিলাম, আমার মন খারাপ করে মানুষের জন্য।’
‘আজ একটা কবিতা লিখেছি। তোমাকে পড়াতে পারলাম না বলে কবিতাটা অর্ধেক রয়ে গেল।’
এদিকে বার্লিনে এলিজাবেথের জীবনও সহজ ছিল না। চারদিকে সন্দেহ, নজরদারি, ভয়। ড্যানিয়েলের চিঠির অপেক্ষায় সে প্রতিদিন ডাকবাক্সের কাছে যেত। চিঠি এলে বুকের ভেতর আলো জ্বলে উঠত; না এলে সে নিজেকে বোঝাত, ডাকব্যবস্থারও নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত সমস্যা আছে।
প্রেমিকের চিঠি না আসার জন্য ডাকবিভাগকে দায়ী করা প্রেমের ইতিহাসে নতুন নয়। তবে যুদ্ধের সময় এই যুক্তির যথেষ্ট বাস্তব ভিত্তি ছিল।
কয়েক মাস পরে একটি চিঠি এল। তাতে ড্যানিয়েল লিখেছে—
‘আমি তোমাকে অপেক্ষা করতে বলব না। অপেক্ষা মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। শুধু এটুকু বলছি, আমার জীবনে যদি কখনও এমন কোনও দিন আসে, যেদিন ভয় থাকবে না, সেদিন আমি তোমাকে খুঁজব।’
এলিজাবেথ চিঠিটা বুকে চেপে ধরে কেঁদেছিল।
তারপর সে উত্তর লিখল—
‘তুমি আমাকে খুঁজবে না। তুমি শুধু বেঁচে থাকবে। খোঁজাখুঁজির কাজটা আমি করব।’
এই মেয়েটির সমস্যা ছিল, সে প্রেমকে কখনও সম্পত্তি মনে করেনি। সে জানত, ভালোবাসার মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাই অনেক সময় তাকে নিজের কাছে রাখার চেয়ে বড় কাজ।
যুদ্ধ শেষ হতে সময় লাগল। ইউরোপের মানচিত্র বদলে গেল, শহর ধ্বংস হল, বন্দিশিবিরের দরজা খুলল, আর পৃথিবী আবিষ্কার করল যে মানুষ সভ্য হয়েও অসভ্য হতে পারে।
হিটলারের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল। নাৎসি অপরাধের সাক্ষ্য সামনে এল। যে রাষ্ট্র একদিন নিজেকে সর্বশক্তিমান ভেবেছিল, তার পতনের সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হল ক্ষমতার সেই পুরোনো সত্য—মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি সিংহাসন যত উঁচুই হোক, তার ভিত দুর্বল।
ড্যানিয়েল যুদ্ধের পর বার্লিনে ফেরার চেষ্টা করল। এলিজাবেথের কোনও নির্ভরযোগ্য খবর সে পায়নি। একসময় সে ভেবেছিল, হয়তো মেয়েটি মারা গেছে। আবার ভাবত, হয়তো কোথাও আছে। মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন অসম্ভবের মধ্যেও সম্ভাবনার জন্য একটা ছোট ঘর রেখে দেয়।
১৯৪৭ সালে সে আবার জার্মানিতে ফিরল।
বার্লিন তখন বিভক্তির পথে। শহরের গায়ে যুদ্ধের ক্ষত, মানুষের মুখে ক্লান্তি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ড্যানিয়েল প্রথম যে জিনিসটি কিনল, তা হল এক কাপ কফি। দ্বিতীয়টি একটি সংবাদপত্র।
তৃতীয়টি কেনার মতো টাকা তার কাছে ছিল না।
একটি ছোট বইয়ের দোকানে ঢুকে সে পুরোনো পরিচিত এক কর্মচারীকে জিজ্ঞাসা করল, এলিজাবেথের খবর জানেন কি না।
লোকটি অনেকক্ষণ ভেবে বলল, ‘এলিজাবেথ? সে তো যুদ্ধের শেষদিকে এক শরণার্থী শিবিরে কাজ করত। পরে কোথায় গেছে জানি না।’
ড্যানিয়েল শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরল। পরিচিত বাড়ি, পরিচিত রাস্তা, পুরোনো গির্জা—সব যেন তার স্মৃতির সঙ্গে তর্ক করছে।
শেষ পর্যন্ত একদিন একটি ছোট হাসপাতালের নথিতে সে এলিজাবেথের নাম পেল। যুদ্ধের সময় সে আহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাহায্য করেছিল। পরে অসুস্থ হয়ে পড়ে, কিন্তু বেঁচে ছিল।
ড্যানিয়েল হাসপাতালের ঠিকানায় গেল।
একটি জানালার পাশে এলিজাবেথ বসেছিল। চুলে কয়েকটি সাদা রেখা, মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু চোখ দুটি সেই একই—যে চোখ একদিন বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে জানতে চেয়েছিল, ড্যানিয়েল প্রেমের বই চিনল কী করে।
দুজনেই প্রথমে চুপ করে রইল।
তারপর এলিজাবেথ বলল, ‘তুমি বুড়ো হয়ে গেছ।’
ড্যানিয়েল বলল, ‘তুমিও।’
‘এতদিন কোথায় ছিলে?’
‘ইংল্যান্ডে।’
‘তা জানি। চিঠিতে লিখেছিলে।’
‘তাহলে আবার জিজ্ঞাসা করলে কেন?’
‘দেখছিলাম, এতদিনে মিথ্যে বলা শিখেছ কি না।’
ড্যানিয়েল হেসে উঠল। বহু বছরের ভয়, অনিশ্চয়তা, শোক আর বিচ্ছেদের মধ্যে সেই হাসিটুকু যেন এক মুহূর্তে তাদের পুরোনো জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
তারপর এলিজাবেথের চোখে জল এল।
‘আমি ভেবেছিলাম, তুমি আর ফিরবে না।’
ড্যানিয়েল বলল, ‘আমিও ভেবেছিলাম, তুমি আর থাকবে না।’
‘তাহলে ফিরলে কেন?’
ড্যানিয়েল তার হাত ধরল।
‘কারণ পৃথিবী এখনও আমাদের কাছে ক্ষমা চায়নি।’
এলিজাবেথ অবাক হয়ে তাকাল।
‘ক্ষমা চাইবে?’
‘না। পৃথিবী কখনও ক্ষমা চায় না। সে শুধু নতুন ক্যালেন্ডার ছাপায়। কিন্তু আমরা যদি আবার বাঁচতে পারি, তা হলে অন্তত প্রমাণ হবে যে পৃথিবী যা করতে চেয়েছিল, সবটা পারেনি।’
এলিজাবেথ তার হাত আরও শক্ত করে ধরল।
সেদিন কোনও বিয়ের প্রস্তাব ছিল না, কোনও কবিতার আবৃত্তি ছিল না, কোনও নদীর ধারে বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ছিল না।
ছিল শুধু দুটো হাত।
যে হাতগুলো একদিন ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল, তারা আবার একে অন্যকে খুঁজে পেয়েছে।
তাদের বিয়ে হল ছোট করে। কয়েকজন বন্ধু, সামান্য খাবার, একটি পুরোনো ঘর। এলিজাবেথের বাবা তখন আর বেঁচে নেই। ড্যানিয়েলের পরিবারেরও অনেকেই ফিরে আসেননি।
বিয়ের দিন পুরোহিত যখন ভবিষ্যৎ জীবনের সুখ-দুঃখে পরস্পরের পাশে থাকার কথা বললেন, ড্যানিয়েল মনে মনে ভাবল, সুখের সময় পাশে থাকার জন্য মানুষকে খুব বেশি সাহসী হতে হয় না। দুঃখের সময় পাশে থাকার জন্য যে সাহস লাগে, তার কোনও সরকারি স্বীকৃতি নেই।
বিয়ের পর এলিজাবেথ বলল, ‘আমাদের একটা বাড়ি দরকার।’
ড্যানিয়েল বলল, ‘বাড়ি হবে।’
‘একটা টেবিল।’
‘হবে।’
‘দুটো চেয়ার।’
‘হবে।’
‘আর বই রাখার আলমারি।’
ড্যানিয়েল একটু চিন্তা করে বলল, ‘আলমারিটা ছোট হলে ভালো হয়।’
‘কেন?’
‘বই কিনতে আমার এখনও অভ্যাস যায়নি।’
এলিজাবেথ বলল, ‘তোমার এই অভ্যাসের জন্যই তো তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। আর এখন সেই অভ্যাসই সংসারের বাজেট নষ্ট করবে।’
ড্যানিয়েল বলল, ‘সংসারে প্রেম থাকলে বাজেট একটু এদিক-ওদিক হতে পারে।’
এলিজাবেথ বলল, ‘এই কথাটা বাজারের মাছওয়ালাকে বোঝাও। সে কিন্তু প্রেমের বিনিময়ে মাছ দেয় না।’
তাদের ছোট্ট সংসার গড়ে উঠল। যুদ্ধের স্মৃতি মুছে গেল না। কিছু রাত এল, যখন ড্যানিয়েল ঘুম ভেঙে উঠে বসত। কখনও কোনও শব্দে এলিজাবেথ চমকে উঠত। অতীতের দরজা একবার খুলে গেলে তাকে আর পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না।
তবু তারা বাঁচতে শিখল।
প্রতি বছর যুদ্ধ শেষ হওয়ার দিনে তারা একটি মোমবাতি জ্বালাত। কারও স্মৃতিতে, কারও জন্য, যাদের নাম তারা জানত না। তারপর জানালার পাশে বসে থাকত।
একদিন এলিজাবেথ বলল, ‘আমরা কি কখনও সত্যিই সুখী হতে পারব?’
ড্যানিয়েল বলল, ‘সুখী হওয়ার সংজ্ঞা কী?’
‘সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হবে, আজ কেউ আমাকে শুধু আমার পরিচয়ের জন্য ঘৃণা করবে না।’
ড্যানিয়েল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, ‘সেদিন পৃথিবী সত্যিই সুখী হবে।’
‘আর তার আগে?’
ড্যানিয়েল তার হাত ধরল।
‘তার আগে আমরা অন্তত নিজেদের ছোট্ট পৃথিবীটাকে বাঁচিয়ে রাখি।’
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। দূরের বাড়িগুলোর জানালায় আলো জ্বলছে। শহরটি নতুন করে তৈরি হচ্ছে। নতুন রাস্তা, নতুন বাড়ি, নতুন সরকার, নতুন প্রতিশ্রুতি।
মানুষ আবার সভ্য হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এলিজাবেথ মোমবাতির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জানো, আমার মাঝে মাঝে ভয় হয়। মানুষ আবার যদি ভুলে যায়?’
ড্যানিয়েল বলল, ‘মানুষ ভুলে যায় বলেই ইতিহাস লেখা হয়।’
‘তাহলে ইতিহাস লিখে লাভ কী?’
‘যারা ভুলতে চায়, তাদের একটু অস্বস্তিতে রাখার জন্য।’
এলিজাবেথ হাসল।
‘তুমি এখনও কবিতা লেখো?’
‘লিখি।’
‘আমাকে নিয়ে?’
‘তোমাকে নিয়ে লিখতে গেলে কবিতা হয় না।’
‘কেন?’
‘তখন সত্যি লিখতে হয়।’
এলিজাবেথ তার কাঁধে মাথা রাখল।
যে পৃথিবীতে একদিন তাদের ভালোবাসাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়েছিল, সেই পৃথিবীর বুকেই তারা পাশাপাশি বসে রইল। তাদের প্রেম কোনও সাম্রাজ্য জয় করেনি, কোনও পতাকা বদলায়নি, কোনও ইতিহাসের বইয়ে নতুন অধ্যায় যোগ করেনি।
তবু তাদের প্রেমের একটি ছোট্ট বিজয় ছিল।
যে শক্তি মানুষকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ আর পরিচয়ের খোপে বন্দি করতে চেয়েছিল, সেই শক্তির বিরুদ্ধে তারা কোনও অস্ত্র ধরেনি। তারা শুধু একে অন্যকে ছেড়ে দেয়নি।
হয়তো এটাই প্রেমের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বক্তব্য।
কারণ ঘৃণা মানুষকে একা করে। প্রেম তাকে অন্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়।
আর পৃথিবী যখন প্রতিদিন মানুষকে শেখায়, কাকে ভয় করতে হবে, কাকে ঘৃণা করতে হবে, কাকে সরিয়ে দিতে হবে—তখন কাউকে ভালোবাসা নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকে না। তা হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রতিবাদ।
ড্যানিয়েল মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল।
এলিজাবেথ বলল, ‘আলোটা নিভিয়ে দিলে কেন?’
ড্যানিয়েল জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘কারণ কাল আবার জ্বালাতে হবে।’
এলিজাবেথ তার হাত ধরল।
বাইরে অন্ধকার ছিল। পৃথিবীর সব অন্ধকার সেদিনও শেষ হয়নি।
কিন্তু ঘরের ভিতরে দুজন মানুষ পাশাপাশি বসেছিল।
আর তাদের মাঝখানে, অন্ধকারের চেয়েও পুরোনো, যুদ্ধের চেয়েও জেদি, ইতিহাসের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী একটি জিনিস বেঁচে ছিল।
ভালোবাসা।
লেখনীতে -রবীন মজুমদার

মন্তব্যসমূহ