৪৬০ একটা গোলাপী প্রেমের গল্প
৪৬০ একটা গোলাপী প্রেমের গল্প
অফিসের ফিসফাস, দম আটকে চুপিচুপি আড্ডা, এমনকি ক্যান্টিনের চা খাওয়ার সময়ও একটাই নাম সবার মুখে ঘোরে— ওঃ বাবা ! 'হিটলার' শুনে নেবে ।
আসল নাম রুদ্র চ্যাটার্জি। শহরের এক নামকরা আর্কিটেকচার ফার্মের সিইও। লোকটার অভিধানে 'দেরি', 'অজুহাত' বা 'হাসি' বলে কোনো শব্দ নেই। ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিসে ঢোকেন, আর তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস খোদ কোম্পানির ডিরেক্টরদেরও নেই।
এই 'হিটলার'-এর রাজত্বেই একদিন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো উড়ে এল নিপা মানে এক সুদৃশ্য, মাথায় একরাশ ববকাট তার সাথে রং করা সোনালী চুলের সমাহার, ঝকঝকে গ্রাউন পরিহিতা মিস নিপা চ্যাটার্জী । হিটলারের সাম্রাজ্যে আজ এই নতুন জুনিয়র আর্কিটেক্টের অভিষেক হলো। প্রথম দিনেই পনেরো মিনিট লেট এবং তাড়াহুড়ো করে ঢুকতে গিয়ে সোজা রুদ্রর কফির কাপে ধাক্কা।
কাঁচের আড়াল থেকে সারা অফিস যখন নিপার চাকরি যাওয়ার ঘন্টাটা কখন বাজবে, সেই আশঙ্কায় ধুকধুক করে ঘড়ির কাটার ক্ষণের হিসাব গুনছে , তখন রুদ্র যেন তার নামের প্রতি যথাযথ মর্যাদা সহকারে দাঁতে উপর দাঁতকে কষে চেপে ধরে বলেছিল, "মিস নিপা, এটা কিন্তু কফিশপ নয়, এটা অফিস।" নিপাও ছাড়ার পাত্রী নয়। বড় বড় চোখ করে বলেছিল, "স্যার, কফিটা বেশি তেতো হয়ে গেলে একটু চিনি মিশিয়ে নিতে হয়, তাতে মেজাজও মিষ্টি থাকে। আর ট্রাফিক জানেনা যে আজকে আমার প্রথম অফিস জয়নিংয়ের প্রবন্ধ আছে, তাহলে হয়তো জ্যামের জন্য ধেয়ান দিতো। আমি এই পনেরো মিনিট লেট হবার কৃতিত্বটা ট্রাফিক অব্যস্থাকেই দিতে চাই। অবশ্য কাল থেকে আর কাউকে কৃতিত্ব বিলাবোনা ঠিক করে ফেলেছি, দেখবেন কাল থেকে ঠিক টাইমে আসব।"
শুরু হলো হিটলার আর নিপার টক-ঝাল পর্ব। মিটিংয়ে রুদ্র রেগে আগুন হলে নিপা খুব শান্ত গলায় এমন একখানা লজিক দিত যে রুদ্রকে বাধ্য হয়ে চুপ করতে হতো। সবার আড়ালে হিটলারের ঠোঁটের কোণে যে এক চিলতে হাসি উঁকি দিত, তা কেউ খেয়াল করত না।
গল্পে মিষ্টি রং লাগল এক বর্ষার সন্ধ্যায়। অফিসে তখন কেউ নেই। নিপা একটা প্রজেক্ট শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে। হঠাৎ তার টেবিলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি নামিয়ে রাখল রুদ্র । কফির পাশে একটা ছোট্ট চিরকুট— "চিনি মেশানো আছে। মেজাজটা মিষ্টি করে কাজটা শেষ করুন।" নিপা অবাক হয়ে দেখল, হিটলারের চোখেও কেমন একটা গভীর মমতার ছোয়া।
কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। বিন্দু বিন্দু করে অন্তরে প্রেমের ফোঁটা যে টপ টপ করে পড়ছে, সেটা অনুভব করলো কিন্তু বাঁধ সাধলো রুদ্র নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার অক্ষমতা , আর নিপা ভাবে রুদ্র তাকে সহ্যই করতে পারে না। একদিন কাজের চাপে রুদ্র প্রচণ্ড বকাঝকা করে নিপাকে। অভিমানে, রাগে নিপা ঠিক করে সে চাকরিটা ছেড়ে দেবে। ইস্তফাপত্র টাইপ করে রুদ্রর ডেস্কে জমা দিয়ে আসে সে। শুরু হওয়ার আগেই যেন শেষ হতে বসল হিটলারের প্রেম।
পরদিন নিপা ব্যাগ গুছিয়ে অফিস থেকে বেরোবে, এমন সময় রুদ্র তার পথ আটকালো। চিরপরিচিত গম্ভীর মুখে তার হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে দিয়ে বলল, "আপনার রেজিগনেশন লেটার অ্যাকসেপ্ট করা হয়নি। তবে একটা নতুন কন্ট্র্যাক্ট পেপার দেওয়া হলো।"
নিপা অবাক হয়ে ফাইলটা খুলে দেখল, সেখানে কোনো অফিসের কাগজ নেই। একটা সাদা পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা— "এই হিটলারের রাজত্বে একজন রানীর খুব প্রয়োজন। বড্ড অসমাপ্ত লাগছে আমাদের গল্পটা। চিরকালের মতো শেষ করবে?"
নিপা চোখ পাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, "হিটলারের রানী হতে গেলে কিন্তু রোজ কফিতে চিনি মেশাতে হবে!" রুদ্র প্রথমবারের মতো শব্দ করে হেসে ফেলল। অফিসের জানলা দিয়ে আসা পড়ন্ত বিকালের রোদে তখন একটা অসমাপ্ত প্রেম পূর্ণতা পাচ্ছিল।


মন্তব্যসমূহ
দ