৪৬১ মুসোলিনির অজানা প্রেমের ইতিহাস
৪৬১ মুসোলিনির অজানা প্রেমের ইতিহাস
ক্ষমতার মঞ্চে একনায়ক, ব্যক্তিগত জীবনে প্রেমিক—নাকি প্রেমের আড়ালে আরেক স্বৈরাচার? না স্বৈরাচারীরা কি প্রেম করে না , হতে পারে সেখানে সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না কিন্তু প্রেম তো ছিল।
সেই নারীর নাম ক্লারা পেতাচ্চি , যিনি ‘ক্লারেত্তা’ নামেই বেশি পরিচিত।
মুসোলিনির প্রেমের ইতিহাস বলতে গেলে শুধু একজন একনায়ক ও তাঁর প্রেমিকার কাহিনি বললে চলে না। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতা ও আকর্ষণের সম্পর্ক, ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রশ্ন, এবং এমন এক প্রেমের ট্র্যাজেডি—যার শেষ দৃশ্য রচিত হয়েছিল ১৯৪৫ সালের ইতালির রক্তাক্ত রাজনৈতিক পতনের মধ্যে।
তবে এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মনে রাখা প্রয়োজন: মুসোলিনির ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বহু বিবরণ এসেছে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিকথা, ডায়েরি এবং পরবর্তী জীবনী থেকে। তাই বহুল প্রচারিত রোমান্টিক কাহিনির সঙ্গে যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যের পার্থক্য রাখা জরুরি।
রাচেলে—যে নারী ছিলেন তাঁর সংসারের ভিত
মুসোলিনির জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নারী ছিলেন রাচেলে গুইদি। তাঁদের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল মুসোলিনির রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার বহু আগে। ১৯১৫ সালে তাঁদের বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে পাঁচটি সন্তান জন্ম নেয়।
বারবার প্রেম করার দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে এক কামরার ঘরে আবদ্ধ রাখতে পারেনি। তাই সে বারেবারে ঘর পরিবর্তন করেছিলেন। তার প্যাথলজিতে ছিল অন্য নারীর প্রতি আকর্ষণ। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গবেষণায় একাধিক প্রেম ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে—একজন মানুষ যখন রাষ্ট্রের কোটি কোটি মানুষের আনুগত্য দাবি করেন, তখন নিজের ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কি একই আনুগত্যের নিয়ম মানেন?
মুসোলিনির জীবন সেই প্রশ্নের একটি অস্বস্তিকর উদাহরণ।
ক্লারেত্তার আবির্ভাব: মুগ্ধতা থেকে অন্তরঙ্গতা
ক্লারা তখন কুড়ি বছরের তরুণী। মুসোলিনির বয়স প্রায় ঊনপঞ্চাশ। তিনি মুসোলিনির প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। তাঁর পরিবারের সামাজিক পরিচিতিও তাঁকে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতার বৃত্তের কাছাকাছি পৌঁছতে সাহায্য করেছিল।
ক্লারা আগে থেকেই মুসোলিনিকে চিঠি লিখতেন। তিনি তাঁকে শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও আদর্শ পুরুষ হিসেবে দেখতেন। প্রথম সাক্ষাতের পরও তিনি যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
কিন্তু এই সম্পর্কের শুরু থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল।
ক্লারার কাছে মুসোলিনি ছিলেন প্রায় দেবতুল্য এক পুরুষ। মুসোলিনির কাছে ক্লারা প্রথমে ছিলেন তাঁর প্রতি মুগ্ধ এক তরুণী। তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা কখন থেকে বাড়তে শুরু করেছিল, তা নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও ১৯৩৬ সালের দিকে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং ১৯৩৭ সাল থেকে সম্পর্কটি অনেক বেশি নিয়মিত হয়ে ওঠে।
প্রেম, ঈর্ষা এবং ক্ষমতার অন্দরমহল
ক্লারেত্তার প্রেমকাহিনির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অথচ জটিল দিকটি হল তাঁর ঈর্ষা।
মুসোলিনি ছিলেন বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী ও সন্তান ছিল। তা ছাড়া অন্য নারীদের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের কথা জানা যায়। অথচ ক্লারা চাইতেন, মুসোলিনি যেন তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দেখেন।
ক্লারার ডায়েরি ও চিঠিপত্রে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে ঈর্ষা, মান-অভিমান, বিচ্ছেদের ভয় এবং একান্ত অধিকারের আকাঙ্ক্ষার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি মুসোলিনির অন্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের খবরে গভীরভাবে বিচলিত হতেন।
ভাবুন, দৃশ্যটি কেমন!
বাইরে মুসোলিনি ইতালির মানুষকে শৃঙ্খলা, কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের পাঠ দিচ্ছেন। তাঁর একটি নির্দেশে সরকারি যন্ত্র সক্রিয় হয়ে উঠছে। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরই এক প্রেমিকা চাইছেন, তিনি যেন অন্য কোনও নারীর দিকে তাকাবেন না।
রাষ্ট্রের শাসক এবং প্রেমের জগতে স্বাধীনতা দাবি করা পুরুষ—এই দুই পরিচয়ের সংঘাত তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
তবে ক্লারাকে নিছক অসহায় প্রেমিকা ভাবলে ভুল হবে। তিনি মুসোলিনির রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক ছিলেন এবং তাঁর ক্ষমতার বৃত্তের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর পরিবারও এই সম্পর্কের মাধ্যমে শাসকের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ পেয়েছিল। ফলে এই প্রেমের মধ্যে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজনৈতিক সুবিধার প্রশ্নও ছিল।
মুসোলিনির অজানা প্রেমের ইতিহাসে ডায়েরির গুরুত্ব
এই সম্পর্কের সবচেয়ে মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হল ক্লারেত্তার নিজের লেখা ডায়েরি ও তাঁদের পারস্পরিক চিঠিপত্র।
ইতিহাসের কাছে এই ডায়েরির গুরুত্ব এখানেই—এটি কেবল জনশ্রুতি নয়, একজন প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর লেখা ব্যক্তিগত দলিল। যদিও ডায়েরি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির দলিল; তাই তার প্রতিটি বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা ইতিহাসের নিয়মের অংশ।
মুসোলিনির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটি বিতর্কিত দাবিও রয়েছে। ইতালির শেষ রানি মারি-জোসে—তখনকার রাজপরিবারের সদস্য—এবং মুসোলিনির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ২০১১ সালে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়।
ক্লারার ডায়েরিতে রাজকুমারী মারি-জোসেকে ঘিরে একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। পরে মুসোলিনির পুত্র রোমানোর বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁদের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী অন্তরঙ্গ সম্পর্কের দাবিও প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না; সম্পর্কটির প্রকৃতি নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
প্রেমিকার সঙ্গে মৃত্যুর পথে
১৯৪৫ সালের এপ্রিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয় প্রায় নিশ্চিত। ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসন ভেঙে পড়ছে। তিনি উত্তর ইতালির দিকে পালানোর চেষ্টা করেন।
২৭ এপ্রিলের কাছাকাছি সময়ে মুসোলিনি ও ক্লারেত্তা পেতাচ্চি ইতালীয় পার্টিজানদের হাতে আটক হন। পরদিন, ২৮ এপ্রিল ১৯৪৫, তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়। ক্লারা চাইলে পালানোর চেষ্টা করতে পারতেন কি না, কিংবা তাঁর সামনে অন্য কোনও বাস্তবসম্মত পথ ছিল কি না—এ নিয়ে পরবর্তী বিবরণে নানা আলোচনা রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মুসোলিনির সঙ্গেই নিহত হন।
ক্লারেত্তার পরিণতিও সেই ইতিহাসের বাইরে নয়। তাঁর মৃত্যু শুধু প্রেমিকার মৃত্যু ছিল না; তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদী শাসকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সমর্থকও। তাই তাঁকে কেবল আত্মত্যাগী প্রেমিকার রোমান্টিক ছবিতে আটকে রাখলে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থান অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রেম কি একনায়ককেও সাধারণ মানুষ করে তোলে?
মুসোলিনির প্রেমের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এখানেই।
একদিকে একজন নারী, যিনি তাঁর প্রেমিককে প্রায় দেবতার আসনে বসিয়েছিলেন। অন্যদিকে একজন শাসক, যিনি জনজীবনে কর্তৃত্ব ও আনুগত্যের প্রতীক হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে একাধিক নারীর সঙ্গে জড়িয়েছিলেন। তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে আবেগ ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল অসম ক্ষমতার সম্পর্ক, ঈর্ষা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও।
প্রেমের জন্য মৃত্যুবরণ করলেই প্রেম পবিত্র হয়ে যায় না; আর কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসলেই তার সমস্ত কাজ নৈতিক হয়ে ওঠে না।
ক্লারেত্তার কাহিনি তাই একই সঙ্গে প্রেমের ইতিহাস এবং ফ্যাসিবাদের অন্তরঙ্গ ইতিহাস। তাঁর ডায়েরি আমাদের মুসোলিনিকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের আলো-আঁধারিতে দেখতে সাহায্য করে, কিন্তু সেই আলো যেন তাঁর শাসনের দায় ও তার শিকার মানুষদের ইতিহাসকে আড়াল না করে।
ইতিহাসের বিচারে এটাই সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা—একজন মানুষের প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নৈতিক মূল্যায়ন দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
প্রামাণ্য গবেষণার বই
Claretta: Mussolini's Last Lover — R. J. B. Bosworth
Yale University Press, 2017
তারিখ ২৬/১০/২৬
মন্তব্যসমূহ