৪৬৩ আমি যদি হতাম বুনোহাঁস
৪৬৩ আমি যদি হতাম বুনোহাঁস
ছোট্ট রিজুর একটা মস্ত দোষ ছিল। যাকে যখন ভালো লাগে, তখনই তার মতো হতে ইচ্ছে করে। দোষ বললাম বটে, কিন্তু বয়স যখন সাত-আট, তখন এই দোষ না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক।
সেদিন সকালে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে রিজু দেখল, একদল বুনো হাঁস আকাশের বুক চিরে উড়ে চলেছে। কী তাদের আনন্দ! কেউ কারও হাত ধরে টানছে না, কেউ বলছে না, ‘সাবধানে হাঁটিস’, কেউ আবার পিছন থেকে চেঁচিয়ে বলছে না, ‘পড়তে বসেছিস তো?’
রিজুর মনে হলো, আহা! হাঁস হয়ে জন্মালে বেশ হতো।
মুশকিল হলো, রিজুর মা-বাবা হাঁসের মতো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। তাঁদের মতে, পৃথিবীতে স্বাধীনতার চেয়ে নিরাপত্তা ঢের বেশি জরুরি। আর নিরাপত্তা বলতে তাঁরা বোঝেন—সকালে দুধ খাওয়া, সময়মতো স্কুলে যাওয়া, বিকেলে অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের কাছে বসা এবং রাত ন’টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া। মাঝখানে মানুষটির নিজের ইচ্ছা বলে যে একটা পদার্থ আছে, সেটা তাঁরা জানেন; কিন্তু তার ব্যবহারিক উপযোগিতা সম্বন্ধে তাঁদের যথেষ্ট সন্দেহ।
রিজু অবশ্য এসব তত্ত্ব বোঝে না। সে শুধু জানে, পুকুরপাড়ের ছেলেগুলোর জীবন ভারি মজার।
তারা একসঙ্গে দৌড়য়, একসঙ্গে পুকুরে ঝাঁপ দেয়, একসঙ্গে স্কুলে যায়, আবার বিকেলে ওই উঁচুনিচু মাঠটায় বল নিয়ে এমন লাফালাফি করে, যেন পৃথিবীর সমস্ত পরীক্ষার খাতা সেদিন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
রিজুর কেবল একটাই দুঃখ—ওরা বুনো হাঁসের মতো উড়তে পারে না।
অবশ্য এ বিষয়ে রিজু এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি। কারণ সে নিজে কখনও চেষ্টা করেনি।
একদিন দুপুরে মা যখন রান্নাঘরে, বাবা তখন খবরের কাগজে দেশের ভবিষ্যৎ উদ্ধার করতে ব্যস্ত, রিজু নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। তার পরনে শুধু একটা হাফপ্যান্ট। সে ভাবল, হাঁসদের তো জামাকাপড়ের ঝামেলা নেই। স্বাধীনতার প্রথম শর্তই বোধহয় এই।
পুকুরে নেমে সে এমন এক লাফ দিল যে, পাশের ঘাটে বসে থাকা এক বৃদ্ধের হাত থেকে খবরের কাগজ প্রায় জলে পড়ে যাচ্ছিল।
বৃদ্ধ বললেন, ‘ওরে বাবা! ওটা কী করলি?’
রিজু বলল, ‘সাঁতার কাটছি।’
‘সাঁতার কাটছিস, না পুকুরের জলটাকে বঙ্গোপসাগরে পাঠাবার ব্যবস্থা করছিস?’
রিজু উত্তর দিল না। পুকুরের অন্য ছেলেরা হেসে উঠল। একজন বলল, ‘আয়, এবার ডুব দিয়ে ওই শ্যাওলাটা ছুঁয়ে আয়।’
রিজু ডুব দিল। উঠে এসে দেখল, আকাশের উপর দিয়ে সেই বুনো হাঁসের দল ফিরে যাচ্ছে। সে হাত নেড়ে চিৎকার করল, ‘এই যে! আমাকেও নিয়ে যাও না ! আমি যে তোমাদের একজন হতে চাই-ই। '
হাঁসেরা কোনও উত্তর দিল না। তারা বোধহয় মানুষের ভাষা জানে না। কিংবা জানে, কিন্তু উত্তর দেওয়ার ঝামেলায় যেতে চায় না।
সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে রিজু যথারীতি বকুনি খেল। মা বললেন, ‘এইভাবে চললে একদিন জলে ডুবে মরবি!’
বাবা বললেন, ‘জীবনে শৃঙ্খলা না থাকলে কিছুই হওয়া যায় না।’
রিজু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, বড়রা সব জানেন, শুধু একটা কথা জানেন না—শিশুরা কেন বুনো হাঁস হতে চায়।
রাতে বিছানায় শুয়ে সে জানলার বাইরে তাকাল। দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকছিল। রিজুর মনে পড়ল, পুকুরের ছেলেগুলোর কথা। তারা কেউ উড়তে পারে না, তবু তাদের হাসির মধ্যে কেমন একটা উড়ে যাওয়ার শব্দ আছে। তারা যখন একসঙ্গে মাঠে দৌড়য়, মনে হয়, মাটিটা যেন তাদের পায়ের নীচে একটু হালকা হয়ে গেছে।
হঠাৎ রিজুর মনে একটা নতুন বুদ্ধি এল।
উড়তে হলে ডানা লাগে—এ কথা কে বলেছে? ডানা না থাকলে মানুষ কি উড়তে পারে না?
পরদিন সকালে মা দেখলেন, রিজু নিজে থেকেই স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছে। বাবা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার? আজ সূর্যটা পশ্চিম দিকে উঠেছে নাকি?’
রিজু গম্ভীর মুখে বলল, ‘না বাবা। আমি আজ বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যাব।’
‘তাতে এমন কী নতুন কথা?’
‘তারপর বিকেলে মাঠে খেলব।’
‘পড়াশোনা?’
‘রাতে করব।’
বাবা চশমার উপর দিয়ে তাকালেন। মা-ও রান্নাঘর থেকে উঁকি দিলেন। তাঁদের মুখে এমন ভাব, যেন বাড়ির ছোট ছেলেটি হঠাৎ রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব হয়ে গেছে।
রিজু কিন্তু মনে মনে হাসল। সে বুঝেছে, বুনো হাঁসের মতো আকাশে উড়তে না পারলেও মানুষের আর-এক রকম ডানা আছে—বন্ধুত্ব, খেলা, কল্পনা আর নিজের মতো করে বাঁচার ইচ্ছা।
সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে দেখল, আকাশের অনেক উপরে বুনো হাঁসের দল উড়ে চলেছে। তাদের গন্তব্য কোথায়, কেউ জানে না। হয়তো তারাও জানে না।
রিজু বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই দেখ! ওরা যাচ্ছে!’
এক বন্ধু বলল, ‘কোথায়?’
রিজু বলল, ‘জানি না। তবে একদিন আমরাও যাব।’
‘কী করে?’
রিজু একটু ভেবে বলল, ‘সেটা বড় হয়ে ঠিক করব।’
তারপর তারা সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।
আকাশে হাঁসেরা উড়ছিল। মাঠে ছেলেরা দৌড়চ্ছিল। আর পৃথিবীর কোথাও একটুখানি স্বাধীনতা চুপিচুপি ডানা মেলছিল।
বড়দের চোখে স্বাধীনতা মানে নিয়মের মধ্যে বাঁচা, আর ছোটদের চোখে—নিয়মের ফাঁক দিয়ে একটু আকাশ দেখে নেওয়া।
রিজু সেদিন আকাশে ওড়েনি। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল, তারও যেন দুটো ডানা গজিয়েছে।
ডানাগুলো অবশ্য চোখে দেখা যায় না। তাই বড়রা এখনও তাকে পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।
লেখনীতে রবীন মজুমদার
তারিখ ৩১ /১০/২৬
বিঃ দ্রঃ - সেই সব শিশুদের সাথে একাত্ম হয়ে বলি যারা সামাজিক অনুশাসনে জোর করে মাটিতে পা দিয়ে থাকে কিন্তু তাদের মনটা কিন্তু সদাই উড়ে চলে দেশ থেকে দেশান্তরে। তার ঠিকানা আমরা কেউ-উ জানিনা। সতর্ক থাকতে হবে যেন সেই বুনো হাঁসদের মনন যেন হনন না হয়ে যায়।

মন্তব্যসমূহ