৪৬২ প্রেম, অহংকার ও এক অসমাপ্ত দাম্পত্যের গল্প
৪৬২ প্রেম, অহংকার ও এক অসমাপ্ত দাম্পত্যের গল্প
স্বর্ণলঙ্কার রাজপ্রাসাদে যে নারী রাবণের হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন, তিনিই কি শেষ পর্যন্ত তাঁর পতন ঠেকাতে পারেননি? নাকি রাবণের প্রতি মন্দোদরীর প্রেম ছিল এমন এক প্রদীপ, যার আলোয় সত্য দেখা যেত, অথচ সেই সত্য গ্রহণ করার সাহস ছিল না রাবণের?
লঙ্কার রাজা তখনও পৃথিবীর ইতিহাসে এক মহাপরাক্রমশালী নাম হয়ে ওঠেননি। তাঁর মধ্যে ছিল অসাধারণ প্রতিভা, দুর্দমনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং নিজেকে সকলের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করার এক অদ্ভুত নেশা। তিনি রাবণ।
অন্যদিকে মন্দোদরী—অপ্সরা হেমার কন্যা, মায়াসুরের সন্তান। সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁর ছিল বুদ্ধি, আর বুদ্ধির সঙ্গে এমন এক সংযম, যা সহজে কারও চোখে পড়ত না।
প্রথম সাক্ষাতের মুহূর্তটি কেমন ছিল, তার নির্দিষ্ট বিবরণ রামায়ণের সব সংস্করণে পাওয়া যায় না। কিন্তু কল্পনার রাজ্যে সেই প্রথম দেখার একটি ছবি আঁকা যাক।
মায়াসুরের প্রাসাদে অতিথি হয়ে এসেছেন রাবণ। চারদিকে রত্নখচিত স্তম্ভ, সুগন্ধি ফুলের সমারোহ, আর দূরে কোথাও বাজছে বীণা।
রাবণ কথা বলছিলেন নিজের বিজয়, নিজের শক্তি আর নিজের ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্য নিয়ে। সভার অধিকাংশ মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। শুধু মন্দোদরী চুপ করে ছিলেন।
রাবণ লক্ষ করলেন।
— তুমি কিছু বলছ না কেন, সুন্দরী? আমার কথা কি তোমার ভালো লাগছে না?
মন্দোদরী মৃদু হেসে বললেন,
— আপনার কথা শুনছি। কিন্তু আপনি যে কতটা শক্তিশালী, তা জানার চেয়ে আপনি নিজের শক্তিকে কী কাজে লাগাবেন, সেটাই আমার বেশি জানতে ইচ্ছে করছে।
রাবণ একটু থমকালেন।
জীবনে অনেকেই তাঁকে প্রশংসা করেছে, অনেকে ভয় পেয়েছে, অনেকে তাঁর কাছে মাথা নত করেছে। কিন্তু এমন প্রশ্ন কেউ করেনি।
সেদিনই হয়তো প্রথমবার রাবণ বুঝেছিলেন, সৌন্দর্য মানুষকে আকর্ষণ করে, কিন্তু প্রশ্ন মানুষকে থামিয়ে দেয়।
আর যে নারী একজন বিজয়ীর পথ আটকে দাঁড়াতে পারে, তার প্রতি আকর্ষণ কখনও কখনও বিজয়ের আকাঙ্ক্ষাকেও ছাপিয়ে যায়।
প্রেমের মধ্যে যে নারী রাজাকে নয়, মানুষটিকে খুঁজেছিলেন
রাবণ ও মন্দোদরীর বিবাহের পর স্বর্ণলঙ্কা হয়ে উঠল তাঁদের সংসারের মঞ্চ।
লঙ্কার রাজা হিসেবে রাবণের জীবনে ছিল অসংখ্য ব্যস্ততা—রাজনীতি, যুদ্ধ, দেবতাদের সঙ্গে সংঘাত, রাজ্যবিস্তার এবং নিজের অমরত্বের স্বপ্ন। কিন্তু রাজমুকুট খুলে রাখার পরও কি একজন মানুষ রাজা থাকেন?
মন্দোদরী সম্ভবত জানতেন, থাকেন।
তাই তিনি শুধু রাবণের রানি হতে চাননি। হতে চেয়েছিলেন তাঁর মনের এমন এক আশ্রয়, যেখানে পরাজয়ের ভয় স্বীকার করা যায়, যেখানে দুর্বলতা প্রকাশ করলে সম্মান কমে না।
এক রাতে রাজকার্য শেষ করে রাবণ ফিরে এসেছেন অন্তঃপুরে। মুখে বিরক্তি, চোখে ক্লান্তি।
মন্দোদরী জিজ্ঞাসা করলেন,
— আজ আবার কার সঙ্গে যুদ্ধ?
রাবণ হেসে বললেন,
— যুদ্ধ না করলে রাবণের নাম থাকবে কী করে?
— আর যুদ্ধ করতে করতে যদি রাবণই হারিয়ে যায়?
রাবণ তাঁর দিকে তাকালেন।
— আমি হারব? আমাকে হারানোর মতো শক্তি কার আছে?
মন্দোদরী তাঁর হাতটি ধরে বললেন,
— তোমাকে বাইরের কেউ হারাতে পারবে কি না, জানি না। কিন্তু তোমার নিজের অহংকার যদি একদিন তোমার বিবেককে পরাজিত করে, তখন তোমাকে বাঁচাবে কে?
রাবণ হেসে উঠেছিলেন। সেই হাসিতে ছিল আত্মবিশ্বাস, হয়তো সামান্য অবজ্ঞাও।
তিনি বুঝতে পারেননি, মন্দোদরী তাঁর শত্রুদের কথা বলছেন না। বলছেন সেই শত্রুর কথা, যে তাঁর নিজের বুকের মধ্যেই বাস করে।
প্রেমের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি প্রিয় মানুষকে নিজের মতো করে পাওয়া নয়; তার ভুলের সামনে দাঁড়িয়েও সত্য কথা বলার সাহস রাখা।
মন্দোদরীর প্রেমের মধ্যে এই সাহস ছিল। কিন্তু রাবণের মধ্যে সেই সত্য গ্রহণ করার ক্ষমতা কতটা ছিল, তা নিয়েই তাঁদের দাম্পত্যের ট্র্যাজেডি।
যে প্রেমের সামনে রাজমুকুটও ছোট হয়ে যায়
রাবণ ছিলেন শক্তিশালী, পণ্ডিত, শিবভক্ত এবং অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এক রাজা। কিন্তু রামায়ণের কাহিনিতে তাঁর চরিত্রের আরেকটি দিকও আছে—অন্যের ইচ্ছা ও অধিকারের সীমা অতিক্রম করার প্রবণতা।
একজন মানুষের যত গুণই থাকুক, তার একটি গুরুতর অন্যায় কি সমস্ত গুণকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে?
মন্দোদরীর জীবনে এই প্রশ্ন ক্রমশ বাস্তব হয়ে উঠল।
রাবণের জীবনে অন্য নারীর প্রসঙ্গ ছিল। বিভিন্ন রামায়ণ-সংস্করণে তাঁর বিবাহ ও সম্পর্কের বিবরণেও পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু মন্দোদরীর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শুধু রাবণের ক্ষমতার অংশীদার ছিলেন না; বহু আখ্যানেই তাঁকে রাবণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ককারী নারী হিসেবে দেখা যায়।
ভাবা যাক, একদিন মন্দোদরী বলছেন,
— তুমি পৃথিবী জয় করতে চাও, করো। কিন্তু মানুষের সম্মান জয় করতে না পারলে সেই জয়ের মূল্য কী?
রাবণ উত্তর দিলেন,
— পৃথিবী শক্তিকে মানে, মন্দোদরী। দুর্বলকে নয়।
মন্দোদরী শান্ত গলায় বললেন,
— পৃথিবী হয়তো শক্তিকে ভয় পায়। কিন্তু ভালোবাসে কাকে, তা শক্তি দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
রাবণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
এই নারীকে তিনি ভালোবাসতেন কি না, সে প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠল অন্য প্রশ্ন—তিনি কি এই নারীটির কথা শুনতেন?
কারণ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা একই জিনিস নয়। কাউকে ভালোবাসা সম্ভব, অথচ তার মতামতকে অবজ্ঞা করাও সম্ভব। রাবণ ও মন্দোদরীর সম্পর্কের ট্র্যাজেডি বুঝতে গেলে এই পার্থক্যটি মনে রাখা দরকার।
সীতাহরণ: প্রেমের সামনে দাঁড়ানো এক ভয়ংকর সত্য
রামায়ণের কাহিনিতে সীতাহরণ রাবণের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সীতাকে লঙ্কায় নিয়ে আসার পর মন্দোদরী তাঁকে সতর্ক করেছিলেন—এমন বিবরণ বিভিন্ন রামায়ণ-পরম্পরা ও পরবর্তী আখ্যানে পাওয়া যায়। সংস্করণভেদে কথোপকথনের ভাষা ও বিবরণ আলাদা।
মন্দোদরীর দৃষ্টিতে সীতাহরণ শুধু রাজনৈতিক বিপদ ছিল না। এটি ছিল নৈতিক সীমালঙ্ঘন, যার পরিণতি হতে পারত ভয়াবহ।
কল্পনায় সেই রাতটি দেখি।
রাজপ্রাসাদের বাইরে সমুদ্র গর্জন করছে। সোনার লঙ্কা চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। অথচ রাবণের অন্তঃপুরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
মন্দোদরী বললেন,
— তুমি তাঁকে ফিরিয়ে দাও।
রাবণ মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
— তুমি কি জানো না, আমি কে?
— জানি। তুমি লঙ্কার রাজা। কিন্তু আজ তুমি এমন একটি কাজ করেছ, যা তোমার রাজত্বকেও বিপন্ন করতে পারে।
— রাম আমাকে পরাজিত করবে? এক বনবাসী রাজপুত্র?
মন্দোদরী এগিয়ে এলেন।
— আমি রামের শক্তির কথা বলছি না। আমি তোমার সিদ্ধান্তের কথা বলছি। অন্যের স্ত্রীকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রেখে তুমি কী প্রমাণ করতে চাও?
রাবণের চোখে ক্রোধ জ্বলে উঠল।
— তুমি কি আমার বিরুদ্ধে কথা বলছ?
মন্দোদরীর চোখে জল এসে গিয়েছিল কি না, তা মহাকাব্য আমাদের নিশ্চিত করে বলে না। কিন্তু কল্পনার এই মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠতে পারে।
— না, রাবণ। আমি তোমার বিরুদ্ধাচরণ করছি না। আমি তোমাকে তোমার নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেখছি। তুমি যদি আজও ফিরে আসতে পারো, তবে হয়তো তোমাকে হারাতে হবে না।
রাবণ উত্তর দিলেন না।
সেদিন তাঁর সামনে দুটি পথ ছিল—নিজের ভুল স্বীকার করা, অথবা নিজের শক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভর করা।
তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলেন।
আর মন্দোদরী বুঝলেন, কখনও কখনও মানুষকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু তার সিদ্ধান্তের ওপর নিজের কোনও অধিকার থাকে না।
যুদ্ধের আগের রাত: স্বর্ণলঙ্কার সবচেয়ে নিঃসঙ্গ নারী
যে রাবণ একদিন নিজের শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতেন, তাঁর চারপাশে আজও সৈন্য, অস্ত্র, মন্ত্রী ও অনুগামী রয়েছে। কিন্তু মন্দোদরী কি বুঝতে পারছিলেন না যে, প্রাসাদের এই বিপুল আয়োজনের মধ্যেও একাকিত্ব ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে?
রাজা যখন ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর পাশে থাকা মানুষদেরও সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হয়।
মন্দোদরী হয়তো ভাবছিলেন—একটি বাক্য কি ইতিহাস বদলাতে পারত? আরেকবার বোঝালে কি রাবণ শুনতেন? নাকি যে অহংকারকে এতদিন তিনি ভালোবাসার ভাষায় বোঝাতে চেয়েছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত সমস্ত ভাষাকে পরাজিত করবে?
তবু তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি শুধু এক অত্যাচারী রাজা ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাঁর স্বামী, তাঁর জীবনের সঙ্গী, তাঁর সন্তানদের পিতা।
এইখানেই মন্দোদরীর যন্ত্রণা।
তিনি রাবণের অন্যায়কে সমর্থন করতে পারেননি। আবার তাঁর পতনও কামনা করেননি।
প্রেমের এই দ্বন্দ্ব সহজ নয়। প্রিয় মানুষের অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়েও তাকে হারানোর ভয় করা যায়। তার ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করেও তার কাজের নিন্দা করা যায়।
মন্দোদরীর প্রেমের সবচেয়ে মানবিক দিকটি এখানেই।
রাবণের মৃত্যু: প্রেম কি তখনও বেঁচে ছিল?
যুদ্ধ শেষ হলো। রাবণ নিহত হলেন রামের হাতে।
স্বর্ণলঙ্কার আকাশে বিজয়ের ধ্বনি উঠল, কিন্তু মন্দোদরীর জীবনে নেমে এল এক গভীর শূন্যতা।
যে মানুষটির অহংকারের বিরুদ্ধে তিনি বারবার কথা বলেছিলেন, সেই মানুষটির মৃত্যুর পর কি তাঁর সমস্ত রাগ মুছে গিয়েছিল?
বাস্তব মানবজীবনে এমন কোনও সরল উত্তর নেই।
একজন মৃত মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তার অন্যায়ের স্মৃতি এবং তার জন্য শোক—এই তিনটি অনুভূতি একই হৃদয়ে সহাবস্থান করতে পারে।
মন্দোদরীর শোকের মধ্যেও রাবণের অন্যায় অদৃশ্য হয়ে যায় না। আবার তাঁর অন্যায়ের কারণে মন্দোদরীর শোকও মিথ্যা হয়ে যায় না।
রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে রাবণের মৃত্যুর পর মন্দোদরীর বিলাপ এবং পরবর্তী জীবনের বিবরণে পার্থক্য আছে। কিছু পরবর্তী আখ্যান ও প্রচলিত কাহিনিতে বিভীষণের সঙ্গে তাঁর বিবাহের কথাও বলা হয়। তাই এই পরিণতিকে সব রামায়ণের অভিন্ন বিবরণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কিন্তু কল্পনার গল্পে আমরা মন্দোদরীকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পারি—যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের সামনে, এক হারিয়ে যাওয়া জীবনের দিকে তাকিয়ে।
তিনি হয়তো মনে মনে বলেছিলেন,
“তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, রাবণ। তোমার ক্ষমতাকে নয়, তোমার ভেতরের মানুষটিকে। কতবার চেয়েছিলাম, তুমি তোমার শক্তির চেয়েও বড় হও। তুমি জয় করতে চেয়েছিলে পৃথিবীকে, অথচ তুমি ভিতরে ভিতরে এমনিই দুর্বল যে নিজের অহংকারের আভিজাত্যের কাছে পরাজিত হলে।
“তোমার জন্য আমার চোখে জল আছে। কিন্তু সেই জল তোমার প্রতিটি কাজের অনুমোদন নয়। আমি তোমাকে হারিয়েছি—আর তোমার ভুলের মূল্য দিয়েছে একটি রাজ্য এবং পত্নী হিসাবে আমি ।”
এটি মন্দোদরীর কল্পিত স্বগতোক্তি, মহাকাব্যের প্রত্যক্ষ উদ্ধৃতি নয়। তবু এর মধ্যে ধরা আছে তাঁদের সম্পর্কের এক গভীর সম্ভাব্য অর্থ।
এই প্রেমের আসল ট্র্যাজেডি কোথায়?
রাবণ ও মন্দোদরীর সম্পর্ককে শুধু সুন্দরী রানি ও পরাক্রমশালী রাজার প্রেমের গল্প হিসেবে দেখলে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। এই কাহিনির মধ্যে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে।
প্রথমত, প্রেম কি মানুষকে বদলাতে পারে?
প্রেম মানুষকে বদলানোর অনুপ্রেরণা দিতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের জন্য নিজের ভুল স্বীকার করার ইচ্ছা দরকার। মন্দোদরী রাবণকে সতর্ক করতে পারেন, তাঁর বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারেন; কিন্তু রাবণের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, ভালোবাসা কি অন্ধ আনুগত্য?
না। মন্দোদরীর চরিত্রের তাৎপর্য হলো, তিনি রাবণের প্রতি অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ প্রেমের অভাব নয়; কখনও কখনও সেটিই গভীরতম উদ্বেগের প্রকাশ।
তৃতীয়ত, একজন মানুষের মহত্ত্ব কি তার প্রতিভা ও ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা যায়?
রাবণের পাণ্ডিত্য, বীরত্ব ও শক্তির কথা রামায়ণ-পরম্পরায় স্মরণীয়। কিন্তু সীতাহরণের মতো কাজ তাঁর চরিত্রকে নৈতিক বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রতিভা মানুষের সম্ভাবনা দেখায়; তার ব্যবহার মানুষের চরিত্র প্রকাশ করে।
মন্দোদরী কি রাবণকে ভালোবাসতেন, নাকি তাঁর সম্ভাবনাকে?
- হয়তো দুটোই।
মন্দোদরী এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, যার মধ্যে ছিল অসাধারণ ক্ষমতা, প্রতিভা ও আকর্ষণ; কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল এমন এক অহংকার, যা তাঁর ভালোবাসার ভাষাকেও অগ্রাহ্য করতে পারত।
রাবণের পতন শুধু এক রাজ্যের পতন নয়—এই গল্পের সাহিত্যিক ব্যাখ্যায় তা আত্মসংযমহীন ক্ষমতারও পতন। আর মন্দোদরীর বেদনা শুধু স্বামী হারানোর বেদনা নয়; প্রিয় মানুষটির মধ্যে যে সম্ভাবনা তিনি দেখেছিলেন, তার অপচয় দেখার বেদনাও।
প্রেম সব সময় মানুষকে সুখী করে না। কখনও প্রেম মানুষকে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করায়, যা সে সারাজীবন এড়িয়ে যেতে চেয়েছে।
রাবণ হয়তো সীতাকে লঙ্কায় বন্দি রাখতে পেরেছিলেন, কিন্তু মন্দোদরীর বিবেককে বন্দি রাখতে পারেননি।
আর মন্দোদরী?
তিনি রাবণকে বাঁচাতে পারেননি। কিন্তু তাঁর সতর্কবাণী রাবণের কাহিনিতে আজও একটি প্রশ্ন রেখে যায়—
যে মানুষ পৃথিবী জয় করতে চায়, সে যদি নিজের অহংকারকে জয় করতে না পারে, তবে তার সমস্ত বিজয়ের শেষ মূল্য কে দেয়—সে নিজে, না তাকে ভালোবাসা মানুষগুলো?
তারিখ ২৭ /১০/২৬
মন্তব্যসমূহ